Calcutta Television Network

নারী কখনও দমনপীড়নের শিকার, কখনও আবার ক্ষমতার অধিকারী, মনসামঙ্গলের অজানা দিক

নারী কখনও দমনপীড়নের শিকার, কখনও আবার ক্ষমতার অধিকারী, মনসামঙ্গলের অজানা দিক

15 August 2026 , 04:42:27 pm

"বন্দিলাম বন্দিলাম মাগো যন্ত্রে দিয়া ঘা ।    

অবধান কর মাগো জগৎ গৌরী মা" ।।

শ্রাবণ মাসে, গ্রাম বাংলার ঘরে কান পাতলে, এখনও কানে আসে কবি বিজয় গুপ্তের রচিত মনসা মঙ্গল-এর এই পংক্তি গুলি। বাংলা সাহিত্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার জুড়ে রয়েছে সাপের দেবী মনসা এবং তাঁকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মনসামঙ্গল কাব্যের আখ্যান। মধ্যযুগের পটভূমিতে রচিত এই কাব্য ধারাটি কেবল দেবীর মহিমা প্রচার-ই করেনি, বরং তৎকালীন বাংলার সামাজিক বিবর্তন, লৌকিক সংস্কৃতির সঙ্গে উচ্চমার্গীয় ধর্মের সংঘাত এবং মানুষের অদম্য জীবনসংগ্রামের ছবি ফুটিয়ে তুলেছে । মঙ্গলকাব্য সংসারে মনসা মঙ্গল কাব্যে প্রায় ৪০০ বছরের সামাজিক ইতিহাসের ছবি ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সাপের মতো এক ভয়ানক প্রাণীকে দেবীরূপে কল্পনা করার পেছনেও লুকিয়ে আছে, মধ্যযুগীয় মানুষের ভয় ও ভক্তি, যা পরবর্তীকালে পৌরাণিক মোড়কে রূপ নিয়েছে অনন্য এক সাহিত্যের। উল্লেখ্য মনসামঙ্গল কাব্যের মূল আকর্ষণ-ই হল এর তীব্র নাটকীয়তা এবং চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে। 

কাহিনীটি গড়ে উঠেছে শিবের মানসকন্যা দেবী মনসা এবং একনিষ্ঠ শিবভক্ত, প্রতাপশালী বণিক চাঁদ সওদাগরের সংঘাতকে কেন্দ্র করে। মর্ত্যলোকে নিজের পূজা প্রতিষ্ঠা করার জন্য, মনসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর একজন সাধারণ মানুষের অহংকার ও আত্মমর্যাদার লড়াই এই কাব্যকে গতিশীল করেছে। দেবাদিদেব মহাদেবের পূজারি চাঁদ, কোনও ভাবেই রাজি ছিলেন না দেবী মনসা পূজার। এই বিরোধের জেরে মনসার রোষে, চাঁদ সওদাগর একে একে তাঁর ছয় পুত্রকে হারান, তাঁর ধনসম্পদ ও বাণিজ্যতরী সাগরে তলিয়ে যায়। কিন্তু সর্বস্বান্ত হয়েও চাঁদ তাঁর জেদ ও অহঙ্কার থেকে সরে আসেননি, যা মানুষের আত্মমর্যাদার উদাহরণ । এই কাহিনীর সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বেদনাবিধুর অংশটি রচিত হয় চাঁদ  সওদাগরের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র লক্ষ্মীন্দর এবং বেহুলার বিয়েকে কেন্দ্র করে। মনসার অভিশাপ থেকে বাঁচতে লোহার বাসরঘর তৈরি করা হলেও, এক সুক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে কালনাগিনী প্রবেশ করে লক্ষ্মীন্দরকে দংশন করে। সদ্য বিবাহিত বেহুলা এই অকালমৃত্যুকে মেনে নেয়নি। সে সমস্ত সামাজিক প্রথা ভেঙে, ভেলায় করে স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে পাড়ি দেয় স্বর্গের উদ্দেশ্যে। বেহুলার এই যাত্রা কেবল এক নারীর পতিভক্তির গল্প নয়, এটি হলো মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক মানুষের জীবনকে ফিরিয়ে আনার অদম্য জেদ এবং সাহসিকতার রূপক। স্বর্গের দেবসভায় নিজের নৃত্য ও আকুল প্রার্থনায় দেবতাদের মন জয় করে বেহুলা তাঁর স্বামীর জীবন এবং শ্বশুরমশাইয়ের হারানো বৈভব ফিরিয়ে আনে। 

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ধারার অন্যতম কাব্য হল মঙ্গল কাব্য। চন্ডী মঙ্গল, মনসা মঙ্গল সহ বিভিন্ন মঙ্গল কাব্য ধারা বাংলার সাহিত্যের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। এই দীর্ঘ কাব্যের রচয়িতা হিসেবে মধ্যযুগের বহু প্রতিভাবান কবির নাম পাওয়া যায়। কানা হরিদত্তকে এই ধারার আদি কবি মনে করা হলেও বিপ্রদাস পিপিলাই, নারায়ণ দেব, দ্বিজ বংশীদাস এবং কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মতো কবিরা এই কাহিনীকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দিয়েছেন। মঙ্গল কাব্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি ছিলেন, পূর্ববঙ্গের কবি বিজয় গুপ্ত। মঙ্গলকাব্যের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য করুণ রসের ব্যবহার। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্যে করুণ রসের পরিচয় মেলে, তবে তা সীমিত আকারে। লৌহ বাসরে লখিন্দরের মৃত্যুর পর  মাতা সনকার বেদনাময় অবস্থার বর্ণনায় ফুঁটে উঠেছে করুণ রস- 

“কবাট করিয়া দূর বাসরে সামায়।

দেখিল সোনার তনু ধূলায় লুটায়।।

দুই হস্তে ধরি রাণী লাখাই নিল কোলে।

চুম্বন করিল রাণী বদন-কমলে।।”১৪।

কবিদের লেখনীতে উঠে এসেছে সেকালের বাংলার নদীমাতৃক রূপ, সমুদ্র বাণিজ্যের রোমাঞ্চকর বিবরণ, এবং বাঙালি অন্দরমহলের সুখ-দুঃখের নিখুঁত চিত্র।

মঙ্গল কাব্যে মনসা, দেবী এবং মানবীয় চরিত্রে উপস্থাপিত; তাঁর প্রতিশোধপরায়ণ, ক্ষমতাশালী, কিন্তু অভিমানী সত্তা মধ্যযুগের বাঙালি নারীর ভেতর-বাইরের দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি বহন করে। মনসার স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধার জন্য সংগ্রাম এবং তাঁকে উপেক্ষা করার ফলে যে প্রতিক্রিয়া তা বাঙালি গৃহস্থালির নারীর জীবন এবং সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাঙালি বাড়ির অন্দরমহলের অভ্যন্তরীণ জীবন ছিল মূলত নারীদের ক্ষমতার কেন্দ্র। সে সময় বাইরের জগতে পুরুষতান্ত্রিক প্রভাব থাকলেও, অন্দরমহলে ক্ষমতার চালিকাশক্তি ছিল নারীরা। মনসার চরিত্রের ক্ষমতা, প্রতিশোধস্পৃহা, এবং অভিমান এই অন্দরমহলের নারীর অবস্থান, তাদের আত্মপরিচয় ও মর্যাদার সংগ্রামের সঙ্গে প্রতীকীভাবে মিলে যায়। মনসার মতো অন্দরমহলের নারীও কখনো দমনপীড়নের শিকার, কখনও আবার ক্ষমতার অধিকারী। লৌকিক দেবীর এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে মূলত সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের সংস্কৃতিরই এক প্রকার স্বীকৃতি ঘটেছিল উচ্চবিত্তের দরবারে।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN