শাস্ত্রীয় রীতি-নীতি আর বৈদিক মন্ত্রের বাইরে, বাংলার মাঠ-ঘাট, বন-বাদাড় আর নদী-নালার কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এক সমান্তরাল দেবলোক। এরা কোনো রাজপ্রাসাদে বা বিশাল পাথরের মন্দিরে থাকেন না, এদের বাস বটতলায়, শ্যাওলা ধরা পুকুরঘাটে, কিংবা মাটির ঢিবিতে। এই দেব-দেবীরা-ই বাংলার 'লৌকিক দেব-দেবী'। সংস্কৃত মন্ত্রের বদলে এরা তৃপ্ত হন অন্তরের সরল আকুতি আর লৌকিক ছড়ায়। বাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, রোগ-শোক আর প্রকৃতির সাথে লড়াইয়ের জীবন্ত দলিল এই লৌকিক দেবতারা।
দক্ষিণ বাংলার লৌকিক দেব-দেবীর মধ্যে প্রকৃতির আদিম রূপটি সবচেয়ে স্পষ্ট। সুন্দরবনের বাঘ আর মানুষের লড়াই যেখানে প্রতিদিনের বাস্তব, সেখানে জন্ম নিয়েছেন দক্ষিণ রায় এবং বনবিবি। দক্ষিণ রায়, তিনি বাঘের দেবতা। তাঁর রূপ ভয়ঙ্কর, হাতে তির-ধনুক, পরনে যোদ্ধার বেশ। কাঠুরে, মধু সংগ্রহকারী আর মৎস্যজীবীরা বনে যাওয়ার আগে দক্ষিণ রায়ের পুজো দেন, যাতে বাঘের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় সম্প্রীতি। এখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই বনবিবির পুজো বা ‘দোয়া’ মাগেন। ‘বনবিবির জহুরনামা’ পালাগানে দেখা যায়, কীভাবে তিনি অত্যাচারী দক্ষিণ রায়কে পরাজিত করে বনের কাঙাল মানুষদের রক্ষা করেছিলেন। এই পুজো কেবল ধর্মের নয়, জীবনের তাগিদে মানুষের এক হয়ে ওঠার গল্প বলে। মেডিক্যাল সায়েন্স যখন গ্রাম বাংলায় পৌঁছায়নি, তখন কলেরা, বসন্ত বা ম্যালেরিয়ার মতো মহামারী থেকে বাঁচতে মানুষ তৈরি করে নিয়েছিল নিজস্ব রক্ষাকর্তা। ওলাদেবী বা ওলাইচণ্ডী: একসময় বাংলায় ওলাওঠা বা কলেরার প্রকোপে গ্রাম কে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। সেই মারণ রোগ থেকে বাঁচতে মানুষ ওলাদেবীর বন্দনা শুরু করে। সাদা শাড়ি পরিহিতা, শান্ত রূপের এই দেবীর কাছে রোগমুক্তির প্রার্থনা করা হতো। শীতলা ও রক্তাবতী, গুটিবসন্ত বা পক্সের হাত থেকে বাঁচতে শীতলা মায়ের পুজো আজও ঘরে ঘরে প্রচলিত। তেমনই চর্মরোগের হাত থেকে রেহাই পেতে বাংলার গ্রামীণ প্রান্তরে পুজো পান রক্তাবতী দেবী। এই দেবতারা আসলে মানুষের অসহায়তার দিনে মানসিক সান্ত্বনার এক একটি স্তম্ভ।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের একটি বড় অংশ জুড়ে আছেন মা ষষ্ঠী। তিনি মাতৃত্ব, সন্তান জন্ম এবং শিশুর সুরক্ষার দেবী। তার বাহন সামান্য এক বিড়াল। কোনো জাঁকজমক নয়, বটতলায় বা ঘরের কোণে পিটুলি দিয়ে এঁকে, দই-হলুদ-দুর্বা ঘাস দিয়ে মায়েরা উপোস করে এই পুজো করেন। গ্রামীণ ছড়ায় গাওয়া হয়, "ষাট ষাট কোলের বাছা বেঁচে থাক।" এই দেবী অত্যন্ত আপন, ঘরের মানুষের মতো। মায়ের কোল আলো করে সন্তান যেন টিকে থাকে, এই আদিম ও শ্বাশ্বত কামনাই ষষ্ঠী পুজোর মূল ভিত্তি। বাংলার কৃষিজীবী সমাজ প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাকে শান্ত করতে প্রকৃতির নানা উপাদানকে দেবতা করে তুলেছে। ঘেঁটু ঠাকুর: ফাল্গুন মাসে গ্রামীণ যুবকেরা ঘেঁটু গানের দল বাঁধে। ঘেঁটু আসলে বুনো তিতো ফুল, যা চর্মরোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। সেই ফুলকে প্রতীক করে এক রূপবান কিশোরের বেশে ঘেঁটু ঠাকুরের পুজো করা হতো, যা আজ প্রায় বিলুপ্ত। মাকাল ঠাকুর: নদীয়া বা ২৪ পরগনার মৎস্যজীবী ও কৃষকদের একাংশের কাছে মাকাল ঠাকুর অত্যন্ত জাগ্রত। ফসলের সুরক্ষা ও ভালো মাছ পাওয়ার আশায় জেলেরাই মূলত এই লৌকিক দেবতার পুজো দিয়ে থাকেন।
আধুনিকতার আলোয় আর শহুরে সংস্কৃতির বিস্তারে এই লৌকিক দেব-দেবীরা ক্রমশ কোণঠাসা। ওলাদেবী এখন কেবল ইতিহাসের পাতায়, ঘেঁটু গান আর শোনা যায় না। তবে সুন্দরবনের গভীরে আজও বনবিবির থান সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ, যেখানেই মানুষ প্রকৃতির রুদ্র রূপের সামনে অসহায়, সেখানেই জন্ম নেয় লৌকিক বিশ্বাস।এই লৌকিক দেব-দেবীরা আসলে কোনো পৌরাণিক স্বর্গলোকের বাসিন্দা নন। এরা মাটির পৃথিবীর, মানুষের যন্ত্রণার ভাগীদার। এদের বাঁচিয়ে রাখার অর্থ হলো বাংলার নিজস্ব লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় মেলবন্ধন এবং গ্রামীণ ইতিহাসের শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখা।