শরতের শেষে,হিমেল হেমন্তের মায়াবী ভোরে কিংবা কোনও এক অমাবস্যার নিশীথ অন্ধকারে বাংলার নাট মন্দির গুলোতে যখন খোল-করতাল,মৃদঙ্গের গুরুগুরু আওয়াজ ওঠে,তখন শাক্ত বাঙালির মন ফিরে যায় আঠারো শতকের সেই চণ্ডীমণ্ডপ গুলোয়। ষোড়শ শতকে চৈতন্য দেবের ভক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলায় শুরু হয় বৈষ্ণব পদাবলী ও কৃষ্ণ নামের প্রসার। কিন্তু সেই একই সময়ে বাংলায় সমান্তরালভাবে জেগে উঠেছিল অন্য এক ধারা,তন্ত্র সাধনা ও আদ্দ্যা শক্তির প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি মেশানো শাক্ত পদাবলী। আর এই ধারারই এক প্রায়বিস্মৃত অথচ উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হলেন নবদ্বীপের মহারাজ শিবচন্দ্র রায় বাহাদুর। যিনি রাজদণ্ড ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কালীনামের একতারা,যাঁর কলমে জন্ম নিয়েছিল শাক্ত সাহিত্যের কালজয়ী কিছু পদ।
অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা তখন রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মোগল সাম্রাজ্যের সূর্য তখন অস্তাচলে, অন্যদিকে ব্রিটিশ শক্তি বাংলা তথা ভারতে তাদের শক্তি বাড়াচ্ছে । এই ঝোড়ো সময়েই নবদ্বীপ রাজপরিবারের উত্তরসূরি মহারাজ শিবচন্দ্র রায় রাজ্যশাসনের ভার নিলেন। কিন্তু তিনি অন্তরে লালন করেছিলেন এক গভীর বৈরাগ্য ও শাক্ত সাধনা। লোকশ্রুতি আছে, রাজকার্যের রাজকীয় আড়ম্বর তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন দেবী আদ্যাশক্তি ও মহাবিদ্যা তারার পরম উপাসক। রাজসভার চাটুকারিতা ছেড়ে তিনি নিমগ্ন হতেন সুরের সাধনায়। সাধক রামপ্রসাদ সেন কিংবা কমলাকান্তের সমসাময়িক বা ঠিক পরবর্তী যুগের এই সাধকরাজা কালী কীর্তনকে নিয়ে গেছিলেন এক অন্য পর্যায় । তাঁর কণ্ঠে মা কালীর বন্দনা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রাণের গান হয়ে উঠেছিল। ‘ন’ অক্ষরের অলঙ্কার বিশিষ্ট,পদ রচনার শৈলী বাংলা সাহিত্যের গবেষকদের আজও চমৎকৃত করে।
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত পদটি হলো—"নীলবরণী নবীনা রমণী, নাগিনী-জড়িত-জটা-বিভূষণী। নীলনলিনী-যিনি-ত্রিনয়নী,নিরখিলাম নিশানাথ-নিভাননী।" এই পদটির প্রতিটি চরণে কেবল ‘ন’ অক্ষরের যে অনুপম অনুপ্রাস ও অলঙ্কার তিনি ব্যবহার করেছেন, তা মধ্যযুগীয় বাংলা কাব্যে এক বিরল নিদর্শন। দেবী তারার করাল অথচ মোহময়ী রূপকে তিনি যেভাবে রাজকীয় শব্দবিন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা একাধারে উচ্চমানের শাস্ত্রীয় কাব্য এবং অন্যদিকে ভক্তির চরম পরাকাষ্ঠা। কাব্যটির পরের ছত্রে তিনি লিখছেন—"নিতম্বে বেষ্টিত শার্দূল-ছাল, নীলপদ্ম করে, করে করবাল,নৃমুণ্ড খর্পর অপর দ্বিকরে, লম্বোদরী লম্বোদর-প্রসবিনী॥" এখানে শান্ত ও রুদ্র রূপের এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটিয়েছেন কবি,যা সাধারণ মানুষের মনে দেবীর প্রতি ভয় দূর করে এক পরম ভালোবাসার জন্ম দেয়।
শিবচন্দ্র রায়ের এই পদগুলো কেবল পুথির পাতায় আটকে থাকেনি। তাঁর গানের সুর এতটাই গভীর ও তান্ত্রিক ভাবোদ্দীপক ছিল যে,যুগের পর যুগ ধরে তা কীর্তনিয়া ও গায়কদের মুখে মুখে প্রবাহিত হয়েছে। এমনকি আজও রামকৃষ্ণ মিশন ও বেলুড় মঠের কালীপূজার রাতে চৌতাল ও একতালের গম্ভীর চালে মহারাজ শিবচন্দ্রের এই কালী কীর্তন পরম শ্রদ্ধায় গাওয়া হয়। রামপ্রসাদের গানে যেখানে রয়েছে এক অভিমানী সন্তানের আকুতি,সেখানে শিবচন্দ্রের গানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দেবী তারার ধ্যানের এক নিগূঢ় তান্ত্রিক রূপ। তিনি লিখেছেন, "নিগমে ইঁহার নিগূঢ় না পায়, নিস্তার পাইতে শিবের উপায়..." অর্থাৎ যাঁর রহস্য বেদ-বেদান্তও ভেদ করতে পারে না, সেই পরমাত্বাই হলেন মা তারা।
আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে যখন শ্যামাসংগীতের রূপ অনেকখানি বদলে গেছে, তখন মহারাজ শিবচন্দ্র রায়ের মতো প্রাচীন পদকর্তাদের সৃষ্টি যেন এক একটি অমূল্য রত্ন। তাঁর এই তান্ত্রিক পদাবলী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলার শক্তি সাধনা কেবল বলিদানের আড়ম্বর নয়, তা আসলে সুর, শব্দ আর ভক্তির এক নিখাদ আত্মনিবেদন। রাজসিংহাসনে বসেও যিনি মায়ের চরণে মাথা সঁপে দিতে পেরেছিলেন, বাংলার সংস্কৃতির ইতিহাসে সেই সাধক রাজা চিরকাল তাঁর 'নীলবরণী'র সুরের মাঝেই বেঁচে থাকবেন।