মণি ভট্টাচার্য: তপন শিকদার, রাজনীতির বড় মঞ্চে থেকেও যাঁর জীবন ছিল মাটির কাছাকাছি ৪১/১, ভূপেন বোস অ্যাভিনিউ, একটি ঠিকানা মাত্র নয়। ভারতীয় জনতা পার্টির বহু কর্মীর কাছে এই বাড়ি আজও এক আবেগের জায়গা। কারণ, এই বাড়ির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বিজেপির প্রবীণ নেতা তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তপন শিকদারের স্মৃতি। রাজনীতির মঞ্চে তাঁর পরিচয় ছিল যথেষ্ট বড়। একবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, দু’বার সাংসদ, দু’বার রাজ্য সভাপতি এবং দলের কেন্দ্রীয় সম্পাদক, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। কিন্তু সেই ক্ষমতা, পদমর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর ব্যক্তিজীবনের সরলতাকে কখনও বদলে দিতে পারেনি। তপন শিকদারের জীবনের সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্তগুলির একটি যেন লুকিয়ে রয়েছে তাঁর নিজের বাড়ির আয়তনের মধ্যেই। প্রায় সাড়ে তিনশো স্কোয়ার ফিটের ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট। পাশাপাশি দু’জন দাঁড়ালেই যেখানে জায়গা কম পড়ে যায়, এমন একটি সরু প্যাসেজ, তিনটি ঘর, এই ছিল তাঁর ঠিকানা। অথচ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা রাজ্য সভাপতি থাকার সময়ও বড় বাড়ি কিংবা বিলাসবহুল আবাসনের প্রয়োজন বোধ করেননি তিনি।
রাজ্য সভাপতি থাকার সময় দলীয় তরফে বারবার আবাসনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা গ্রহণ করেননি তপন শিকদার। তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমার থাকতে যতটুকু জায়গা লাগে, আমার জন্য ততটুকুই যথেষ্ট।” রাজনীতিতে যেখানে পদ ও ক্ষমতার সঙ্গে জীবনযাপনের পরিসর অনেক সময় বদলে যায়, সেখানে তপন শিকদারের এই জীবনযাপন নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল দায়িত্বের জায়গা, ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার মাধ্যম নয়, তাঁর জীবন সম্পর্কে এই স্মৃতিই আজও তাঁর ঘনিষ্ঠদের কথায় ফিরে আসে।
এই ছোট্ট ফ্ল্যাটেই তিনি আমৃত্যু থেকেছেন। আজও সেই ঘরে তাঁর ব্যবহৃত চেয়ারটি যত্ন করে রাখা রয়েছে। যে চেয়ারে বসে তিনি দলের কাজ করতেন, কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করতেন—সময় পেরিয়ে গেলেও সেই চেয়ার যেন তাঁর উপস্থিতির স্মৃতি বহন করে চলেছে। তাই তপন শিকদারের পরিবারের কাছে কিংবা তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের কাছে ৪১/১, ভূপেন বোস অ্যাভিনিউ শুধুমাত্র একটি বাড়ি নয়। সেটি স্মৃতির জায়গা, রাজনৈতিক আদর্শের জায়গা, আবেগের জায়গা। কারও কারও কাছে সেটি যেন মন্দিরের মতোই পবিত্র।
তাঁর কাকা তপন শিকদারের স্মৃতির সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই পরিচিত বিধায়ক সৌরভ শিকদারও সেই আবেগকে সঙ্গে নিয়েই জন্মশতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। যে বাড়িতে ছোটবেলায় তিনি বড় হয়েছেন, যে জায়গায় তাঁর কাকার রাজনৈতিক জীবনের অসংখ্য স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে, সেই বাড়িতেই তাঁর ব্যবহৃত চেয়ারের সামনে মাল্যদান করে দিনের সূচনা করেছেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় দলের কর্মীরাও। এই শ্রদ্ধা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাকে স্মরণ করা নয়। বরং একটি রাজনৈতিক প্রজন্মের জীবনযাপন ও মূল্যবোধকে স্মরণ করা। তপন শিকদারের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো তাঁর পদগুলির তালিকায় নয়, বরং তাঁর জীবনযাপনের সরলতায়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদ পেয়েও বাড়ি বদলাননি। সাংসদ হয়েও জীবনযাপনে আড়ম্বর আনেননি। রাজ্য সভাপতি হয়েও বড় আবাসনের প্রয়োজন মনে করেননি। কয়েকশো স্কোয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটেই থেকে দেখিয়ে দিয়েছেন—একজন মানুষের পরিচয় তাঁর বাড়ির আয়তনে নয়, তাঁর কাজ ও আদর্শে।
সময়ের সঙ্গে রাজনীতি বদলেছে, বদলেছে রাজনৈতিক পরিসরও। কিন্তু কিছু মানুষের জীবন তাঁদের সময়কে ছাপিয়ে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। তপন শিকদারের জীবনও তেমনই এক স্মৃতি—যেখানে বড় পদে থেকেও ব্যক্তিগত জীবন ছিল সাধারণ, আর রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালেও ছিল একজন সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপনের অনুশীলন। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে ৪১/১, ভূপেন বোস অ্যাভিনিউয়ে যখন মাল্যদান হয়, তখন তাই শুধু একজন প্রাক্তন সাংসদ বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে স্মরণ করা হয় না। স্মরণ করা হয় সেই মানুষটিকে, যিনি বিশ্বাস করতেন—নিজের প্রয়োজন যতটুকু, জীবনও ততটুকুই। আর সেই কারণেই হয়তো সাড়ে তিনশো স্কোয়ার ফিটের সেই ছোট্ট ফ্ল্যাট আজও এত বড় এক স্মৃতির ঠিকানা।