ঘরেবাইরে তিনি প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন। যে-নেত্রীর জন্য তিনি ‘জীবন-যৌবন’ উৎসর্গ করেছেন, তিনিই তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। সংসদের বাদল অধিবেশনে নিলম্বিত হয়েছেন তিনি। এবং, অধিবেশ চলাকালীন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁকে। ভিতরে তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী মহুয়া মৈত্র একাই ফুটেজ খেয়ে নেবেন, তা জেনেও।
এমতাবস্থায়, মনে-মনে ‘একলা চলো রে’ গেয়ে চলেছেন শ্রীরামপুরের সাংসদ তথা আদি তৃণমূলের অকৃত্রিম মুখ।
বিধানসভায় তৃণমূলের মহাবিপর্যয়ের পর যখন কালীঘাটের সর্বেশ্বরীকে ত্যাগ করে ভিন্ন শিবিরে ভিড়েছেন তৃণমূলের আশি শতাংশ বিধায়ক, তখন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। কুণাল ঘোষও কালীঘাট-তৃণমূলে রয়েছেন ঠিকই। তবে, কুণালের থেকেও কল্যাণের ওজন অনেক বেশি। লোকসভায় তৃণমূলের সাংসদ হয়ে লম্বা ইনিংস খেলেছেন তিনি। তৃণমূল জন্ম নেওয়ার আগে থেকেই তিনি মমতা-পন্থী। তবুও তাঁকে অপমানিত হতে হচ্ছে পদে-পদে। এবং, সেই অপমান করছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন-- কল্যাণের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একুশে জুলাই কালীঘাট-তৃণমূল সভা করার অনুমতি পায় বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে। সেই মঞ্চে নায়ক-নায়িকাদের ভিড় নেই। হেভিওয়েট নেতাদেরও ভিড় নেই (কারণ তাঁরা প্রতিপক্ষ-শিবিরে ভিড়েছেন)। এই পরিস্থিতিতে, কল্যাণ না-হয় একটু বেশি সময়ে বক্তৃতা করেছেন। তাই বলে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার!
এখানেই শেষ নয়। মহিলাদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ও মহিলাদের প্রতি তাঁর অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে কল্যাণকে গোটা বাদল অধিবেশনে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এখন ঘরেবাইরে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন।
মঙ্গলবার তারামণ্ডলের সামনে একুশের সভামঞ্চ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরই কল্যাণের মুখে শোনা গেছে সেই একই কথা, ‘‘খালি অভিষেক-অভিষেক’’ কেন? হয় অভিষেক থাকবেন দলে নয় তিনি থাকবেন দলে। এবং, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে দলনেত্রীকেই। পর্যবেক্ষকরা হিসেব করে বলছেন, এই নিয়ে নেত্রীকে অন্তত তিন-তিনবার এই বার্তা দিলেন কল্যাণ। তবু, নেত্রী কিন্তু বললেন, “অভিষেক বাঘের মতো লড়াই করছে”।
একুশের মঞ্চে কল্যাণের দীর্ঘ বক্তৃতা নিয়ে নেত্রীর সঙ্গে তাঁর নতুন করে মনোমালিন্যের সূচনা হয়। অনেকদিন পরে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেয়ে কল্যাণ নাকি দীর্ঘক্ষণ বক্তৃতা করেন। যে কারণে, অন্যান্যরা ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পাননি। এমতাবস্থায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিতিবিরক্ত হয়ে কল্যাণকে থামতে বললে, কল্যাণ অসন্তুষ্ট হন। নিজের বক্তব্য শেষ করে গটগটিয়ে স্টেজ থেকে নেমে গাড়িতে চেপে নিজের বাড়ি অভিমুখে রওনা দেন কল্যাণ। মঞ্চে তখনও বক্তব্য রাখেননি নেত্রী!
এমতাবস্থায়, দৃশ্যতই অপমানিত কল্যাণ বলেন, “দলে আমার কোনওদিনই গুরুত্ব ছিল না। সবাই যখন চলে যায়, আমি তখন পাশে ছিলাম। একুশে জুলাইয়ে ভিড় দেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। সেই কারণেই আবার আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার।”
এরপরই অভিষেককে নিশানা করেন কল্যাণ, “কোনও রক্তের সম্পর্কের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেত্রী হননি। উনি দল তৈরি করেছিলেন। উনিই শেষ করেছেন। সবসময় অভিষেক অভিষেক করলে চলবে না। ডেরেক অভিষেক যা বলবে তা হবে না। আমি ৮০ বা ২০ জনের মতো নেই।”
পর্যবেক্ষকদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বিধানসভায় ঋতব্রত-শিবিরে যোগ দেওয়া বিধায়ক ও লোকসভায় কাকলি-শিবিরে যোগ দেওয়া সাংসদদের কথা বলতে চেয়েছেন কল্যাণ। কিছুদিন আগেই কল্যাণকে বলতে শোনা গিয়েছিল, “অভিষেক দলটাকে শেষ করে দিল”।
ঘরে-বাইরে প্রত্যাখ্যাত কল্যাণের থিম সং এখন, 'একলা বলো রে'।