সোদপুর থেকে বর্ধমান, বনগাঁ থেকে বাদুড়িয়া, শিলিগুড়ি, কাঁথি, রিষড়া, লাটাগুড়ি, রাজ্যের একের পর এক প্রান্তে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের অভিযানে সামনে আসছে খাবারের মান নিয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। কোথাও ফ্রিজে রাখা খাবারে ফাঙ্গাস, কোথাও খাবার সতেজ ও আকর্ষণীয় দেখাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও রং, আবার কোথাও কোনও বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই চলছে রেস্তোরাঁ। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের প্লেটে ঠিক কী খাবার পৌঁছচ্ছে, তা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।
গতকাল মধ্যমগ্রামের পর সোদপুরে বন্ধ তিন রেস্তোরাঁ
অভিযানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্রগুলির একটি উঠে এসেছে সোদপুরে। অভিযোগ, নামী ও দামি রেস্তোরাঁগুলিতেও খাবারের গুণগত মান যাচাই না করেই একের পর এক খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ ও পরিবেশন করা হচ্ছিল। ফ্রিজ এবং খাবার রাখার স্টোর থেকে মিলেছে নষ্ট ও ফাঙ্গাস ধরা খাবার। বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে ভেজালের অভিযোগ। অভিযোগ, কিছু খাবার তৈরিতে বা খাদ্যপণ্যে Metanil Yellow-এর মতো নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর রং ব্যবহারের বিষয়টিও নজরে এসেছে আধিকারিকদের। এমনও অভিযোগ উঠেছে, কয়েকটি রেস্তোরাঁ কোনও বৈধ খাদ্য লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা চালাচ্ছিল। সবকিছু খতিয়ে দেখে ফুড সেফটি দফতরের আধিকারিকরা সোদপুরের একটি রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেন। একইসঙ্গে তিনটি রেস্তোরাঁর সেল বা বিক্রি বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
একই ছবি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে
তবে ঘটনা শুধু সোদপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্ধমান, বনগাঁ, বাদুড়িয়া, শিলিগুড়ি, কাঁথি, রিষড়া, লাটাগুড়ি-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের অভিযান চলছে। একাধিক জায়গায় খাবার সংরক্ষণে গাফিলতি, পচা ও নষ্ট খাদ্যসামগ্রী, বাসি মাংস এবং খাবারকে সুস্বাদু বা সতেজ দেখাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।
একদিকে ভাগাড় কাণ্ডের পুরনো স্মৃতি, অন্যদিকে দোকান ও রেস্তোরাঁয় পচা-বাসি খাবার নিয়ে বারবার অভিযোগ, তার মধ্যেই রাজ্যজুড়ে এই অভিযান সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনওরকম আপস করা যাবে না বলেই এবার কড়া অবস্থান নিয়েছে খাদ্য সুরক্ষা দফতর।
খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহের সূচনার পরেই জোরদার অভিযান
প্রসঙ্গত, গতকাল মুখ্যমন্ত্রী নিজে খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহের সূচনা করেছেন। তার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের অভিযান জোরদার হয়েছে। আর সেই অভিযানেই একের পর এক জায়গায় উঠে আসছে খাদ্য ব্যবস্থার উদ্বেগজনক ছবি। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের বার্তা স্পষ্ট, ব্যবসা করতে কোনও বাধা নেই, বরং ব্যবসায়ীদের পাশে প্রশাসন রয়েছে। কিন্তু ব্যবসা করতে হলে খাদ্য সুরক্ষার সমস্ত নিয়ম ও মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনওরকম খেলা বরদাস্ত করা হবে না।
এই বিষয়ে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক প্রসেনজিৎ বটব্যাল বলেন, সতেজ ও সঠিক খাবার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের একাংশ ভেজাল ও পচা খাবার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষের সুরক্ষার স্বার্থে এই ধরনের কাজ বন্ধ করতেই হবে। খাদ্য সুরক্ষা দফতরের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, নিয়ম না মানলে শুধুমাত্র সতর্ক করেই ছেড়ে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, লাইসেন্স সাসপেন্ড বা বাতিলও করা হতে পারে।
রাজ্যজুড়ে তাই এখন একটাই প্রশ্ন, হোটেল বা রেস্তোরাঁয় আমরা যে খাবার খাচ্ছি, তা সত্যিই কতটা নিরাপদ? খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহের মধ্যেই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠে নেমেছে খাদ্য সুরক্ষা দফতর। অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে আরও উদ্বেগজনক ছবি।