বীরভূমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা অনুব্রত মণ্ডলের উপর হামলা। বুধবার রাতে সিউড়ির তৃণমূল কার্যালয়ে ঢুকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে তাঁর সামনেই তাণ্ডব চালাল তিন যুবক। গতকাল ঘটনার পর রাতেই অভিযুক্তদের আটক করে পুলিস। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছেড়ে দেওয়া হয় অভিযুক্তদের।
পুলিস সূত্রে খবর, এই ঘটনায় অনুব্রত বা তাঁর দল গণতান্ত্রিক তৃণমূলের তরফে কোনও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। এমনকি পুলিসের তরফেও স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করা হয়নি। সেই কারণেই অভিযুক্তদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিস। অথচ পার্টি অফিসে ভাঙচুরের ভিডিও ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। এমতাবস্থায় নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বলেও মনে করছে অনেকে।
ধৃত তিন যুবক হলেন আকাশ দেবনাথ, বান্টি বীরবংশী ও ঋষভ গোর। তিনজনেরই বাড়ি সিউড়ির হাটজন বাজার এলাকায়। পুলিস সূত্রের দাবি, লিখিত অভিযোগ না থাকায় রাতেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে এমন ঘটনার পরেও কেন মামলা হল না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়ার পিছনে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। যদিও স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তিনজনই এলাকায় 'ভাল ছেলে' বলে পরিচিত এবং কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত নন।
উল্লেখ্য, বুধবার বিকেলে গাছের ডাল, চ্যালাকাঠ ও লাঠি হাতে সিউড়ির পার্টি অফিসের দোতলায় ওঠেন ওই যুবকরা। অনুব্রত তখন সেখানেই বসেছিলেন। তাঁকে চেয়ারে বসিয়ে রেখেই শুরু হয় ভাঙচুর। তাঁর পাঞ্জাবির কলার ধরে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। চেয়ার-টেবিল, এসি সব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। টেবিলের কাচ ছিটকে এসে লাগে অনুব্রতর মুখে। গোটা সময় তিনি হাসিমুখে বসে ছিলেন।
হামলাকারীরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, গত ১৫ বছরে বীরভূমে অনেক অত্যাচার করেছেন কেষ্ট। ‘গরুচোর’ বলে কটাক্ষও করা হয়। এক যুবক বলেন, “আর একটাও কথা না... ১৫ বছর কত ডায়লগ দিয়েছ, কত অত্যাচার করেছ।” এই বলে সামনের টেবিলে ডাল দিয়ে মারেন তিনি।
অনুব্রতর সঙ্গীরা তখন দর্শকের ভূমিকায়। এক হামলাকারী প্রশ্ন করেন, 'লোকগুলোকে কেন মেরেছিলেন?' কেষ্ট জবাব দেন, 'কাকে মেরেছি বলো।' পাল্টা যুবক বলেন, 'দেখাব কাকে কাকে মেরেছেন।' অনুব্রত বলেন, 'দেখাও না।' আরেকজন বলেন, 'এখান থেকে আর বেরোতে দেব না। খুন করলে তো একবারে শেষ।' এসময় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। তখন অনুব্রতকে বলতে শোনা যায়, 'আমি অভিষেককে পছন্দ করি না।' হামলাকারীদের দাবি, তাঁরা ‘আমজনতা’, তৃণমূল আমলে কেষ্টর জন্য অত্যাচারিত হয়েছেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে দু'জনকে নিরস্ত্র করে।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন গণতান্ত্রিক তৃণমূলের নেতা ও রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, 'আমাদের নেতা অনুব্রত মণ্ডলের উপর যেভাবে হামলা হয়েছে, তার নিন্দার ভাষা নেই। মুখ্যমন্ত্রী বলেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আজকের ঘটনা প্রমাণ করল শাসকের আইন চলছে।' যদিও এই নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বীরভূমের ঋতব্রত তৃণমূলের আরেক নেতা কাজল শেখ। তাঁর কথায়, 'দেখে মনে হচ্ছে সাজানো ঘটনা।'
মমতা তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, 'এইসব ঘটনা সমাজ ও আইনশৃঙ্খলার পক্ষে ক্ষতিকর। রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একটু পরেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলবেন, এদের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক নেই।' পাল্টা বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা বলেন, 'উনি কিছুদিন আগেই বলেছিলেন ‘সেই ফুটুনি কি আর আছে!’ ফুটুনি থাকে জনতার হাতে। তাঁরা অত্যাচারিত হয়েছেন বলেই আজ এমন ঘটনা ঘটাচ্ছেন। তবে এমন ঘটনা কাঙ্ক্ষিত নয়। আইনের উপর ভরসা রাখুন। বাংলায় আইনের শাসন চলছে।'