Calcutta Television Network

ঈশ্বর গুপ্তের কলমে লোভ, বাঙালির পাতে স্বাদ...

ঈশ্বর গুপ্তের কলমে লোভ, বাঙালির পাতে স্বাদ...

29 September 2025 , 12:53:24 pm

'রসভারা রসময়, রসের ছাগল।/ তোমার কারণে আমি, হয়েছি পাগল।' ঈশ্বরগুপ্তের এই কবিতার লাইনগুলো দেখলেই জিভে আসে জল। নিজেকে যেন কোনও মতেই আটকে রাখা যায় না। আজ এই পাঁঠাকে নিয়েই কিছু বক্তব্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যঙ্গ-রসাত্মক কবি ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর লেখনীতে সমাজ ও বাঙালির দৈনন্দিন অভ্যাসের হাস্যরসাত্মক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর লেখা ‘পাঁঠা কবিতা’ বিশেষভাবে পরিচিত। এখানে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে মানুষ পাঁঠার মাংসের প্রতি আকৃষ্ট হয় একদিকে লোভ, অন্যদিকে আনন্দের ছোঁয়া। কবিতার লাইনগুলো যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজো কেবল দেবী আরাধনার উৎসব নয়, বরং বাঙালির খাবারের উৎসবও বটে।

দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, বরং খাবারের উৎসবও। ষষ্ঠী থেকে দশমী-পুরো উৎসবকালীন সময়ে পাড়ায়, বাড়িতে, আত্মীয়ের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন থাকে। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ নিঃসন্দেহে পাঁঠার মাংস। সপ্তমীর দুপুরে খিচুড়ি-ল্যাবড়ার সঙ্গে পাঁঠার কষা। অষ্টমীর সন্ধিপুজোর পর লুচি, দোপেয়াজা বা কালিয়া। নবমী রাতের পুজোতে রেজালা বা চাপ। উফ্ সে এক অসাধারণ শান্তি। 

ঈশ্বর গুপ্তের ভাষায়, 'পাঁটা মানেই পরিপূর্ণ তৃপ্তি।' কবিতার লাইনগুলো যেমন বাঙালির রসনার লোভ ফুটিয়ে তোলে, তেমনি পুজোর টেবিলেও একই আবহ বিরাজমান। 

অনেকে দেবীর বিসর্জনের আগে মাংস খেতে অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের জন্য তৈরি হয় নিরামিষ পাঁঠা, সেটা ঠিক কীরকম! চলুন একবার দেখে আসি সেই সেটাই। আলু, ফুলকপি, বেগুন, কচু দিয়ে এমনভাবে রান্না করা হয় যে স্বাদে মাংসের ঝোলের মতো লাগে। এটি মজা করে বলা হয়, 'নিরামিষ পাঁঠার ঝোল।' নিরামিষ পাঁঠার জনপ্রিয়তা এই কৌশলের মাধ্যমেই বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে ঢুকে গেছে। মাংস খেতে না চাইলেও স্বাদে কেউ বঞ্চিত হন না। 

পুজোর ভোজ কেবল খাদ্য নয়, সামাজিক মিলনের মাধ্যম। পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে পাত পেড়ে খাওয়া যায় এই পুজোর সময়কালেই। তারওপর বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর আড্ডা হয়। পাড়ার ক্লাব বা মহা ভোজে পাঁঠা রেসিপি আলোচনার কেন্দ্র। এই মিলনশীল অভিজ্ঞতা দুর্গাপুজোর আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়। 

পরশুরাম রাজশেখর বসুর ‘লম্বকর্ণ’ গল্পে দেখা যায় কিভাবে একটি ছাগল পরিবারের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ছাগলের কালো দেহ, লটপটে কান, ছোটো শিং উফ্ সব মিলিয়ে পরিবারের সদস্যদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ফুটে ওঠে। ছোটদের লোভ, বড়দের মন্তব্য, সব মিলিয়ে পাঁঠার প্রতি বাঙালির রসনাভিলাস এবং সামাজিক হাস্যরস প্রকাশ পায়। 

ঈশ্বর গুপ্তের কবিতার লাইন এবং রাজশেখর বসুর গল্প, দু’টোই প্রমাণ যে বাঙালির পাঁঠাপ্রীতি শুধুই খাদ্যসংক্রান্ত নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও হাস্যরসাত্মক অভিজ্ঞতার অংশ।

আজকের কলকাতা বা শহুরে বাঙালির পুজো-রসনায় দুটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বনেদি বাড়ির আঙিনায় বলির মাংস, নিরামিষ পাঁঠার ঝোল। পরিবার ও আত্মীয়ের সঙ্গে ঘরোয়া ভোজন। 

এই পাঁঠার ব্যাপক পরিচিতি রেস্তোরাঁ ও ফুড ট্রেন্ডেও। ফাইন ডাইনিং, সুশি, বিরিয়ানি, বার্গার। অনলাইন অর্ডার ও রেস্তোরাঁর কিউ। ফুড ভ্লগিং এবং গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব। 

শহরের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় পুজোর আগে এবং সময়ে আসন বুকিং ৯০% এর বেশি। ফুড ডেলিভারি অ্যাপের অর্ডার দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। 

ফুড সার্ভিস খাতের বাজারমূল্য ৮,০৫৫ কোটি টাকা, যা আগামী দুই বছরে ১০,০০০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে অনুমান। পুজোর সময় রেস্তোরাঁ বিক্রিবৃদ্ধি ২৫% উপরে। খাদ্যসংস্কৃতির পরিবর্তন কর্মসংস্থান, খরচের ধরন এবং সামাজিক আড্ডাকেও প্রভাবিত করছে। এই তথ্য দেখায় যে, পুজোর খাবার শুধুমাত্র স্বাদ নয়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাবও রাখে। 

পুরনো প্রথা এবং নতুন রীতির মিলনশীলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলা যায় বনেদি বাড়ির রান্না ও রেস্তোরাঁর ফাইন ডাইনিং একসঙ্গে বাঙালির পুজো-রসনা গড়ে তুলেছে। ঠাকুমা নবমীর ঝোল-মাংসে শান্তি খুঁজছেন, নাতিরা ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করছেন। দুর্গাপুজো এখন কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সামাজিক মিলন, আড্ডা, শপিং এবং রসনার পূর্ণ তৃপ্তির উৎসব। 

ঈশ্বর গুপ্তের ‘পাঁঠা কবিতা’ যেমন বাঙালির খাদ্যলালসা তুলে ধরে, তেমনি আজকের দুর্গাপুজোয় পাঁঠা কেবল খাবার নয়, পরিবার, বন্ধু, পাড়ার আড্ডা এবং রেস্তোরাঁর মিলনের মাধ্যম। পুজোর টেবিলে ঐতিহ্যবাহী ঝোল ও রেজালার সঙ্গে এখন ফাইন ডাইনিং, আন্তর্জাতিক কুইজিনও যুক্ত হয়েছে। সুতরাং, কবিতার পাঁঠা যেমন রসনার লোভ জাগায়, তেমনি আজকের বাঙালির পাতে পাঁঠা দুর্গাপুজোর স্বাদের অঙ্গ।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN