দোল উৎসব, যা উত্তর ভারতে হোলি নামে অধিক পরিচিত, ভারতীয় উপমহাদেশের এক প্রাচীন ও আনন্দময় বসন্তোৎসব। বাংলায় এই উৎসব বিশেষভাবে পরিচিত “দোলযাত্রা” নামে। এর প্রকৃত ইতিহাস বহুস্তরীয়—ধর্মীয়, পৌরাণিক ও সাংস্কৃতিক ধারার সম্মিলনে গড়ে উঠেছে এই উৎসবের ঐতিহ্য।
দোল উৎসবের প্রধান ধর্মীয় ভিত্তি পাওয়া যায় পুরাণে বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা-র লীলাকাহিনিতে। বৃন্দাবনে কৃষ্ণের রঙ খেলা ও রাধার সঙ্গে তাঁর প্রেমলীলা থেকেই রঙের উৎসবের প্রচলন হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। বিশেষত বৃন্দাবন ও মথুরা অঞ্চলে দোল বা হোলি আজও অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক কাহিনি জড়িত আছে ভক্ত প্রহ্লাদ ও অসুররাজ হিরণ্যকশিপুর সঙ্গে। হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা আগুনে পুড়ে মারা যান, আর ভক্ত প্রহ্লাদ রক্ষা পান ঈশ্বরের কৃপায়। এই ঘটনাকে স্মরণ করে দোলের আগের রাতে “হোলিকা দহন” প্রথা পালিত হয়, যা অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক।
বাংলায় দোল উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত বৈষ্ণব ধর্মচর্চা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-র আবির্ভাব তিথিও দোল পূর্ণিমার দিনেই। ফলে বাংলায় এই দিনটি গৌর পূর্ণিমা হিসেবেও পালিত হয়। ভক্তরা কীর্তন, আবির খেলা ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে উৎসব উদযাপন করেন।
আধুনিক যুগে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন-এ বসন্ত উৎসবের মাধ্যমে দোল এক নতুন সাংস্কৃতিক মাত্রা পেয়েছে, যার প্রবর্তক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এখানে নৃত্য, গান ও আবিরে রঙিন হয়ে ওঠে প্রকৃতি ও মানুষ।
অতএব, দোল উৎসব কেবল রঙের খেলা নয়; এটি প্রেম, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়ের প্রতীক বহনকারী এক চিরন্তন ঐতিহ্য।