বাংল...">

Calcutta Television Network

সোনার দুর্গা, বাঘ বাহন! ময়নাগুড়ির মা গোসানির একদিনের পুজো...

সোনার দুর্গা, বাঘ বাহন! ময়নাগুড়ির মা গোসানির একদিনের পুজো...

1 October 2025 , 12:23:50 pm

বাংলার দুর্গোৎসব মানেই পাঁচ দিনের মহোৎসব-ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত মণ্ডপমেলা, ধূপধুনো, ভোগপ্রসাদ, ঢাকের বাদ্যি আর সিঁদুরখেলা। কিন্তু এই চেনা ছবির বাইরে বাংলার আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অচেনা ও রহস্যময় আখ্যান। ঠিক তেমনই এক অনন্য দুর্গাপুজো হয় উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির খয়ের খাল গ্রামে। এখানকার দেবী দুর্গা নন, পূজিতা হন 'মা গোসানি'। তাঁর পুজো হয় একদিনের জন্য-শুধুমাত্র মহানবমীতে।

আরও অদ্ভুত বিষয় হল-এই দেবী সিংহের পিঠে নয়, বরং বাঘের পিঠে আরোহী। হাতে অস্ত্র কম, শোভা আছে ভিন্ন মাত্রায়। জনশ্রুতি, রহস্য আর অটুট বিশ্বাসে ঘেরা এই পুজো আজও একইভাবে পালিত হয়ে আসছে, যা বাংলার লোকায়ত দুর্গারূপকে নতুন আলোয় সামনে আনে।

গল্পের শুরু আজ থেকে দেড়শো বছর আগে, ব্রিটিশ শাসনের কালে। খয়ের খালের রায় বংশের দুই ভাই-পার্বতীচরণমহেন্দ্রনাথ রায়ের বাড়িতে একদিন এক অচেনা সন্ন্যাসী আগমন করেন। তাঁর হাতে ছিল এক ক্ষুদ্র সোনার দুর্গামূর্তি, মাত্র তিন-চার ইঞ্চি উচ্চতা। মূর্তি তুলে দিয়ে তিনি বলেন,

'যদি আমি ফিরে আসি, এই মূর্তি আমিই নিয়ে যাব। যদি আর না ফিরি, তবে মহানবমীর দিনে মূর্তির পূজা করবে'

সন্ন্যাসী আর ফেরেননি। সেই থেকেই শুরু হয় খয়ের খালের একদিনের দুর্গাপুজো। তবে এই দেবী দুর্গা নামে পরিচিত নন, তিনি হলেন 'মা গোসানি'

মা গোসানির সোনার মূর্তি আকারে ছোট হলেও রূপে অদ্ভুত। তিনি দশভুজা, কিন্তু দুই হাতে আছে কেবল ত্রিশূল। অন্য আট হাত সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। আশ্চর্যের বিষয়, এখানে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক কেউ নেই। আরেকটি বড় পার্থক্য, দেবীর বাহন সিংহ নয়, বাঘ। লোকবিশ্বাস বলে, এই বাঘশোভা দেবীকে শুধু ভয়ঙ্করী নয়, বন্য প্রকৃতির রক্ষাকর্ত্রী রূপেও তুলে ধরে।

মা গোসানির পুজো মহানবমীর দিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত হয়নবমীর দিন ভোরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। বিসর্জন হয় দশমীর দিনে গঙ্গাজলে নয়, বরং গোপন আস্তানায় স্থানান্তর। একসময় ছাগ বলি হত, তবে এখন আর হয় না। সাদামাটা নিরামিষ ভোগ, মাঝে মাঝে মিষ্টান্ন

গ্রামের নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিবার প্রতি বছর পালাক্রমে এই পুজোর দায়িত্ব নেন। যে বছর যার পালা পড়ে, পুরো বছর সেই পরিবারেই সোনার মূর্তি গোপনে রক্ষিত থাকে। স্বাধীনতার কিছুদিন পর দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজেন রায়, যিনি ছিলেন গোসানি মন্দিরের প্রথম সেবায়েততিনি মন্দিরে মূর্তি রাখার জন্য গোপন কক্ষ নির্মাণ করেনকিন্তু পরে ডাকাতদল সেই মূর্তি লুঠ করে নিয়ে যায়বহু খোঁজাখুঁজির পর স্বপ্নাদেশে মূর্তি উদ্ধার হয়

তারপর থেকে আজও মূর্তিকে মন্দিরে প্রকাশ্যে রাখা হয় নামহানবমীর পূজা শেষে দশমীতে বিশেষ আচার শেষে মূর্তিকে নিয়ে যাওয়া হয় এক অজ্ঞাত গোপন আস্তানায়, কড়া পুলিসি পাহারায়এখনও গ্রামের মানুষও জানেন না দেবীর সেই গোপন আস্তানা কোথায়কেবলমাত্র মন্দির কমিটিদায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবারই জানে

খয়ের খালের মানুষ বিশ্বাস করেন, মা গোসানি তাদের রক্ষা করেন রোগ-শোক, দারিদ্র্য ও অশুভ থেকেতাঁর সোনার মূর্তি অলৌকিক শক্তির অধিকারিণীনবমীর পূজা না হলে গ্রামের মঙ্গল বিঘ্নিত হয়গ্রামবাসীরা বলেন, 'মা আমাদের গ্রামছায়া, তাঁকে ছাড়া পুজো-উৎসব কল্পনা করা যায় না'

এই আখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলার লোকসংস্কৃতিতে দুর্গার বহু রূপ বিদ্যমান। চণ্ডী, মনসা, শীতলা, শাস্থী দেবীর মতো গোসানি দেবীও এক লোকায়ত দুর্গারূপ। তিনি নেই মণ্ডপে। নেই শিল্পীর গড়া চিত্রমূর্তি। নেই পাঁচদিনের ধুমধাম। কিন্তু আছেন বিশ্বাসে, আছেন গোপন আস্তানায়, আছেন গ্রামীণ মানুষের আধ্যাত্মিক সুরক্ষার প্রতীক হয়ে। যুগ পাল্টেছে, সমাজ পাল্টেছে, কিন্তু খয়ের খালের মা গোসানি আজও সমান ভক্তিভরে পূজিতা। কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো যেমন ঐতিহ্য, ময়নাগুড়ির মা গোসানি তেমনই রহস্যময় জনশ্রুতি-ভিত্তিক ঐতিহ্য।

মা গোসানির পুজো বাংলার দুর্গোৎসবকে এক অন্য দৃষ্টিকোণ দেয়। এখানে নেই আলোঝলমলে মণ্ডপ বা দীর্ঘ উৎসব, আছে একদিনের নিবেদিত পুজা, রহস্যময় রীতি, আর গোপন বিশ্বাস। সোনার মূর্তি, বাঘের বাহন, অজানা ডেরা, সবকিছু মিলিয়ে ময়নাগুড়ির খয়ের খাল যেন লোকায়ত দেবীর অলৌকিক এক অধ্যায়। 

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN