দুর্গোৎসবের মূল পর্ব আসলে শুরু হয় মহাসপ্তমীতে। এর আগে ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন হলেও সপ্তমীর ভোরে যখন গঙ্গা বা নদীর ঘাটে সম্পন্ন হয় নবপত্রিকা স্নান, তখনই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মায়ের আরাধনা। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকাকে বলা হয় কলাবউ।
একটি কলাগাছকে শাড়ি পরিয়ে, তার সঙ্গে আরও আটটি পবিত্র গাছ বেঁধে তৈরি হয় নবপত্রিকা। দেবীর শক্তির প্রতীক হিসেবে ধরা হয় এই গাছগুচ্ছকে। সপ্তমীর সকালে সেই কলাবউকে নদী বা পুকুরের পবিত্র জলে স্নান করানো হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় দেবীপক্ষের মূল পূজা।
আজ ভোর থেকেই কলকাতার গঙ্গার ঘাটে ছিল উপচে পড়া ভিড়। পুরোহিতেরা মন্ত্রোচ্চারণ করছেন, পুজো উদ্যোক্তারা নির্দিষ্ট নিয়মে নবপত্রিকাকে স্নান করাচ্ছেন। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ঢাকের আওয়াজে যেন নদীর বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ।
৪৪১ বছরের প্রাচীন ভট্টাচার্য বাড়ির কালো দুর্গাপুজো সপ্তমীতেও সম্পন্ন হল নবপত্রিকা স্নান ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা। মায়ের সেই অপরূপ রূপ দর্শনের জন্য ভিড় জমিয়েছেন অগণিত ভক্ত।
৫১৬ বছরের প্রাচীন জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির পুজোতেও সপ্তমী মহাধুমধামে পালিত হচ্ছে। নাটমন্দিরে চলছে চণ্ডীপাঠ, প্রবীণ সদস্য প্রণত বসু নিজে তদারকি করছেন সমস্ত আচার। সন্ধ্যায় হবে বিশেষ অর্ধরাত্রির পুজো। এদিকে কাছেই শিলিগুড়ির মহানন্দা ঘাটে সকাল থেকেই শহরের নানা বনেদি বাড়ির নবপত্রিকা স্নান চলে।
বর্ধমানের কৃষ্ণসাগর থেকেই ঘট উত্তোলন করে শুরু হল মহাসপ্তমীর পুজো। স্থানীয় মানুষ ভোর থেকেই ঘাটে ভিড় জমালেন। শিল্পাঞ্চল আসানসোলে নিয়ামতপুর, কুলটি, রানিগঞ্জ-সব জায়গাতেই একই রীতি। ভোরের আলো ফোটার আগেই সম্পন্ন হল নবপত্রিকা স্নান, সঙ্গে দেবীর আহ্বান।
ভোর থেকেই কাটোয়ার ভাগীরথীর ঘাট গমগম করছে ভিড়ে। দেবরাজ ঘাট, গোয়ালপাড়া ঘাট-সবখানেই বনেদি বাড়ি ও ক্লাবের পুজোর উদ্যোক্তারা একে একে নিয়ে আসছেন তাঁদের নবপত্রিকা। স্নান করিয়ে ঘট মাথায় নিয়ে আবার ফিরছেন মণ্ডপে, দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার জন্য।
নবপত্রিকা মানে নয়টি গাছের সমাহার- কলা (প্রধান, যাকে কলাবউ বলা হয়), কচু, হলুদ, জয়ন্তী, ধান, অশোক, বেল, দারিম্ব, অরুম (মান্দার)।
প্রকৃতির এই গাছগুলো দেবীর বিভিন্ন রূপ ও শক্তির প্রতীক। দেবী কেবলমাত্র একটি মূর্তি নন, তিনি প্রকৃতির অন্তরে বিরাজমান। তাই সপ্তমীর এই আচার মূলত প্রকৃতির আরাধনার মধ্য দিয়ে মাতৃবন্দনা।
নবপত্রিকা স্নানের পরে হয় দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা। ষষ্ঠীর বোধনের পর সপ্তমীতেই দেবী পূর্ণভাবে বিরাজ করেন তাঁর সন্তানদের সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক। তাই সপ্তমী থেকেই শুরু হয় আসল দুর্গোৎসবের আমেজ।
প্রাচীন বনেদি বাড়ি হোক কিংবা শহরের ক্লাব পুজো সব জায়গাতেই মহাসপ্তমীর সকাল একই রকম আবেগে ভরপুর। নবপত্রিকা স্নান যেন কেবল একটি আচার নয়, বরং মানুষ ও প্রকৃতির মিলিত আরাধনার প্রতীক। নদীর ঘাট থেকে পুজোমণ্ডপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে সেই পবিত্র স্পন্দন। মহাসপ্তমীর নবপত্রিকা স্নান মানেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল মাতৃ আরাধনা, শুরু হল দুর্গোৎসবের মূল পর্ব।