মহাভারতে বর্ণিত নন্দ উৎসব হলো হিন্দু দেবতা শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমির ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে পালিত একটি বিশেষ আনন্দ উৎসব। পুরাণ মতে, শ্রী কৃষ্ণের জন্মের পর গোকুলে তাঁর পালিত পিতা নন্দ মহারাজ ও মাতা যশোদার গৃহে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। ঘরে কৃষ্ণ লাভের আনন্দে নন্দ মহারাজ ব্রাহ্মণ ও গো-পালকদের প্রচুর ধন, রত্ন, অলংকার এবং গাভী দান করেছিলেন। গোকুলবাসীরা আনন্দে একে অপরের গায়ে হলুদ, দুধ, দই ও জল ছিটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। মহারাজা নন্দকে ঘিরে এই উৎসব হয়েছিল বলে এই উৎসবের নাম নন্দ উৎসব।
নন্দ উৎসবের মাহাত্ম কী?
সনাতন ধর্মে এই নন্দ উৎসবের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক মাহাত্ম্য অপরিসীম-
মহাভারত অনুযায়ী, কংস ছিলেন বৃষ্ণি রাজ্যের অত্যাচারী শাসক। তার রাজধানী ছিল মথুরা। পুরাণে তাকে অসুর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, এবং হরিবংশ গ্রন্থে তাকে একজন অসুর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যিনি একজন মানুষের দেহে পুনর্জন্ম লাভ করেছিলেন। অত্যধিক অত্যাচারী হওয়ায় মথুরাবাসী সবসময়ই ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতেন। এই অত্যাচারী অসুরের হাত থেকে মথুরাবাসীতে রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু কৃষ্ণ রূপে আবির্ভূত হলেন।
কংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পিতা বসুদেব নবজাতক কৃষ্ণকে মথুরা থেকে গোকুলে নন্দ মহারাজের বাড়িতে রেখে আসেন। তার পরের দিন সকালে গোকুলবাসী কৃষ্ণের জন্মের খবর জানতে পারেন। পুত্র লাভের পরম আনন্দে শ্রী কৃষ্ণের পালক পিতা গোকুল রাজ নন্দ এক বিশাল মহোৎসবের আয়োজন করেন, যা ইতিহাসে 'নন্দোৎসব' নামে পরিচিতি পায়। এই দিনটি মূলত অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে প্রজাদের মুক্তির দিন তাই ঈশ্বরের প্রতি ভক্তদের গভীর বাৎসল্য প্রেম ও নিখাদ আনন্দ উৎসব পালনের দিন।
পৌরাণিক গ্রন্থ গর্গ সংহিতার 'গোলকখণ্ড'-এর দ্বাদশ অধ্যায়ে নন্দ উৎসবের বিশেষ মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। বৈষ্ণব ধর্মে জন্মাষ্টমীর ব্রত বা উপবাস পালনের পরদিন সকালে কৃষ্ণের চরণে অন্ন ভোগ নিবেদন করার মাধ্যমে উপবাস ভঙ্গ করার নিয়ম রয়েছে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই দিনে ভক্তিভরে কৃষ্ণের সেবা করলে সংসারের সমস্ত অমঙ্গল দূর হয় এবং গৃহ সুখ-শান্তিতে ভরে ওঠে। এই দিনে বালগোপাল বা নাড়ু গোপালকে ৫৬ ভোগ, খিচুড়ি, লুচি, সুজি এবং কাঁচকলার বিভিন্ন সুস্বাদু পদ রান্না করে নিবেদন করা হয়। গোকুলবাসীরা যেভাবে আনন্দোচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিলেন, সেই ঐতিহ্য মেনে মথুরা, বৃন্দাবন ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভক্তরা একে অপরের গায়ে দই, হলুদ ও জল ছিটিয়ে আনন্দ করেন। উঁচু স্থানে মাখনের হাঁড়ি বেঁধে তা ভাঙার প্রতিযোগিতাও এই উৎসবের অন্যতম অঙ্গ। নন্দোৎসবের পুণ্য তিথিতে অসহায় মানুষকে অন্ন ও বস্ত্র দান করা এবং পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।