ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে 'আলাউদ্দিন খিলজি' নামটি উচ্চারণমাত্রই ভেসে ওঠে রক্ত, রাজনীতি, ষড়যন্ত্র ও নিষ্ঠুরতার এক প্রতীকী চিত্র। তিনি খিলজি বংশের দ্বিতীয় সুলতান, মোগল আক্রমণ থেকে ভারতকে রক্ষা করা এক বীর সেনানায়ক, কিন্তু একইসঙ্গে ভয়ংকর এক শাসক, যিনি নিষ্ঠুরতার জন্য ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছেন। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রানি পদ্মিনীর কিংবদন্তি, চিতোর দুর্গে জওহরের বিভীষিকা, আর সেনাপতি মালিক কাফুরের সঙ্গে রহস্যময় সম্পর্ক।
ইতিহাস বলছে, ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বাংলার বীরভূমেই জন্ম নেন আলাউদ্দিন খিলজি, তখনকার নাম ছিল 'আলি গুরশপ'। তিনি ছিলেন খিলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান জালালুদ্দিন খিলজির ভাই শিহাবুদ্দিন মাসউদের পুত্র অর্থাৎ, জালালুদ্দিনেরই ভ্রাতুষ্পুত্র। ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি, যুদ্ধকৌশল ও কূটনীতিতে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছিলেন আলাউদ্দিন।
জালালুদ্দিন তাঁকে নিজের জামাতা করে দিল্লির আমির-ই-তুজুখ পদে নিয়োগ করেন। কিন্তু সেই কাকা-শ্বশুরকেই একদিন বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে হত্যা করে দিল্লির সিংহাসনে বসেন আলাউদ্দিন। ১২৯৬ সালের ২১ অক্টোবর রাজ্যাভিষেক হয় তাঁর এভাবেই শুরু হয় এক নির্মম ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।
আলাউদ্দিনের সময়েই ভারতবর্ষে একের পর এক মোঙ্গল আক্রমণ নেমে আসে। এই ভয়ংকর যাযাবরদের বিরুদ্ধে তিনি ছয়-ছয়বার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ইতিহাস বলে, এক যুদ্ধে প্রায় তিন লক্ষ মোঙ্গল সৈন্য হত্যা করেছিলেন তিনি। এর পর বহু বছর মোঙ্গলরা আর ভারত আক্রমণের সাহস করেনি।
এই সাফল্যের পরই আলাউদ্দিনের চোখ পড়ে ভারতের বাকি রাজ্যগুলির দিকে। গুজরাট, রণথম্বোর, চিতোর, মালব, দেবগিরি, বরঙ্গল, দোরসমুদ্র-একটির পর একটি রাজ্য জয় করতে থাকেন তিনি। মলিক কাফুরের নেতৃত্বে দক্ষিণ পর্যন্ত প্রসারিত হয় খিলজি সাম্রাজ্য।
আলাউদ্দিন নিজেকে 'সিকান্দার-এ-সানি' বা দ্বিতীয় আলেকজান্ডার বলে পরিচয় দিতেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একচ্ছত্র শাসন উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত সমগ্র ভারত তাঁর শাসনের ছায়ায় থাকবে।
তবে যুদ্ধজয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন কূটনীতিতে তুখোড়। দক্ষিণের রাজ্যগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে করদ রাজ্য বানিয়ে দিলেন, যাতে তারা দিল্লিকে নিয়মিত রাজস্ব দেয়। কিন্তু উত্তর ভারতের হিন্দু রাজ্যগুলির প্রতি তাঁর নীতি ছিল নিষ্ঠুর। চিতোরে ৩০ হাজার হিন্দু নিধন, দাসে পরিণত হওয়া অসংখ্য কৃষক সবই তাঁর অমানবিক নীতির ফল।
নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল। তাই সাধারণ প্রজাদের উপর করের বোঝা বাড়িয়ে দেন আলাউদ্দিন। কৃষিজমির উপর ৫০% কর, সঙ্গে জিজিয়া ও ধর্মীয় কর এই ভারে ভেঙে পড়েছিল দেশ। অসংখ্য কৃষক দাসে পরিণত হয়। আলাউদ্দিনের নির্দেশ ছিল, 'হিন্দুরা যেন ঘোড়া কেনার সামর্থ্য না রাখে।' তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যাতে কোনও দিন তারা সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তুলতে না পারে।
আলাউদ্দিন শুধু যুদ্ধবাজ নন, কঠোর প্রশাসকও ছিলেন। মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ করেন, বাজারের দাম নির্দিষ্ট করেন, ওজন বা দামে প্রতারণা করলে ভয়ংকর শাস্তি দিতেন। একাধিক গুপ্তচর বাহিনী তৈরি করেন উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ওপর নজর রাখার জন্য। কালোবাজারি বা ঘুষের অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি হত নির্মম।
কিন্তু তাঁর এই কড়াকড়ির আড়ালে জন্ম নেয় ভয় ও সন্দেহ। রাজপ্রাসাদ জুড়ে তখন শুধুই অবিশ্বাস, ষড়যন্ত্র আর রক্তপাতের ইতিহাস।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলাউদ্দিন মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকেন। অসুখে-অসুখে ক্লান্ত শরীর, আর মাথায় সর্বক্ষণ সন্দেহ কেউ না কেউ তাঁকে মেরে ফেলবে। তখনও তাঁর পাশে ছিলেন একমাত্র বিশ্বস্ত সেনাপতি মালিক কাফুর যার উপর তিনি অন্ধবিশ্বাস করতেন।
কিন্তু ইতিহাস জানায়, সেই বিশ্বাসই শেষমেশ তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। কাফুর ধীরে ধীরে প্রাসাদের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেয়। আলাউদ্দিনের অনুগত আমিরদের একে একে সরিয়ে দেয়। অবশেষে ১৩১৬ সালের জানুয়ারি মাসের এক অন্ধকার রাতে, অসুস্থ সুলতানকে গোপনে হত্যা করা হয়। হত্যাকারী আর কেউ নন তাঁর প্রিয় সেনাপতি, বিশ্বাসভাজন, সহচর মালিক কাফুর।
যে মানুষ একদিন দিল্লির সিংহাসন দখল করেছিলেন নিজের কাকার রক্তে হাত রাঙিয়ে, শেষমেশ তাকেও বিশ্বাসঘাতকতার বিষ পান করতে হয়েছিল। ইতিহাস যেন রক্তের প্রতিশোধ নিয়েছিল।
আলাউদ্দিন খিলজি একদিকে বীরযোদ্ধা, অন্যদিকে নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী। ভারতবর্ষের ইতিহাসে তিনি এক অমোঘ বৈপরীত্যের প্রতীক যেখানে সাহস, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অমানবিকতা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক কিংবদন্তি, যার শেষ অধ্যায় আজও ইতিহাসপ্রেমীদের কৌতূহল জাগায়।