'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বল হরি বোল'- এই ছড়া যেন এক চিরন্তন বাঙালি স্মৃতি। ফাল্গুনের পূর্ণিমা এলেই শৈশবের উঠোনে ফিরে আসে সেই আগুনের লেলিহান শিখা, সেই সমবেত উচ্ছ্বাস।
দোলযাত্রার আগের রাতেই পালিত হয় ‘ন্যাড়াপোড়া’। শুকনো ডাল, পাতা, খড়, গাছের ডালপালা জড়ো করে বানানো হয় ‘বুড়ির ঘর’। তারপর পূর্ণিমার চাঁদের নীচে আগুন ধরানো হয় সেই কাঠামোয়। এই আগুন কেবল কাঠ-খড় পোড়ায় না- প্রতীকী অর্থে পুড়িয়ে দেয় অশুভ শক্তি, মনের কালিমা, জমে থাকা দুঃখ ও হিংসা। আগুনের মধ্য দিয়েই শুভ শক্তির উদয়, নতুন শুরুর আহ্বান।
অনেকেই হয়তো এই রীতির গভীর তাৎপর্য জানেন না। অথচ বহু প্রাচীন এই আচার বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলার বাইরে এটি পরিচিত ‘হোলিকা দহন’ নামে। পুরাণে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষার জন্য ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় হোলিকার দহন- সেই ঘটনাকেই স্মরণ করা হয় এই আগুন জ্বালিয়ে। হোলির আগের দিন খোলা মাঠে কাঠ ও খড়কুটো জড়ো করে হোলিকার প্রতীকী দহন করা হয়।
তবে ন্যাড়াপোড়া শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক সামাজিক উৎসবও। একসময় দোল মানেই ছিল রঙের উন্মাদনা- রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পথচারীদের গায়ে আবির ছোড়া, বাড়ির ছাদ থেকে বালতি বালতি রঙ ঢালা...., ঠিক যেমন আজ ‘ভোকাট্টা’ চিৎকারে আকাশ কাঁপানো সেই চিৎকার অতীত ঠিক তেমনই এমন করে দোল খেলার সেই চেনা চিত্রও আজ অতীত। শহরের ব্যস্ততা, নিয়মকানুন, পরিবেশ সচেতনতা- সব মিলিয়ে বদলে গেছে উৎসবের সেই চেনা চেহারা।
এখন আর সারা রাত ধরে বাজি পোড়ানো হয় না। যদিও পরিবেশ দূষণের কথা ভেবে এই পরিবর্তন জরুরি, তবুও সেই আগুনের চারপাশে বসে গল্প করা, কচিকাঁচাদের কলরব, হাসি-ঠাট্টা- এসব যেন ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় সরে গেছে। হয়তো গ্রাম বা মফস্বলে এখনও কোথাও কোথাও সেই পুরনো আমেজ টিকে আছে, কিন্তু শহরতলীতে তা প্রায় হারিয়ে গেছে।