ফাটল ধরেছিল আগেই। এবার সেই অবিশ্বাসের ফাটল আরও চওড়া হল ইন্ডিয়া জোটে।
চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তার আগের বছর বিজেপি-বিরোধী ইন্ডিয়া জোট তৈরি হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধে জোটের প্রথম বৈঠক হয় পাটনাতে, নীতীশ কুমারের উদ্যোগে। কংগ্রেস থেকে শুরু করে ডিএমকে, আপ, বাম-সহ বিজেপি-বিরোধী দলের প্রথম সারির নেতৃত্ব সেই বৈঠকে বসেন। মাঝপথে বারেবারে বাগড়া দেন মমতা। নীতীশকে জোটের মুখ হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হয় না। এবং, নীতীশ ফিরে যান এনডিএ-তেই।
চব্বিশের লোকসভা ভোটে ইন্ডিয়া জোটের সৌজন্যেই বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। টিডিপি ও জেডিইউ-কে সঙ্গে নিয়ে সরকার গড়তে হয়।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ৫ টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোট হয়। সেই ভোটের আগেই ইন্ডিয়া জোটের শরিকরা একে অন্যের দিকে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে শুরু করে। বাংলায় রাহুল গান্ধী প্রচারে এসে দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপশাসন ও মেরুকরণের রাজনীতির জন্যই রাজ্যে বিজেপির এত রমরমা। যার পাল্টা আক্রমণ করতে বেশি সময় নেননি তৃণমূল নেতৃত্বও। তদানীন্তন বামরাজ্য কেরলে প্রচারে গিয়ে বামেদের সঙ্গে বিজেপির সেটিংয়ের অভিযোগ তোলেন রাহুল।
ফল ঘোষণার পর কেরলে বামেদের বিপর্যয় হয়। বাংলাতে তৃণমূলকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। আর তামিলনাড়ুতে স্ট্যালিনের ডিএমকে ইন্ডিয়া জোটের শরিক হলেও, বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সরকার গঠনে বিজয় তলপতির দলকে সমর্থন করে কংগ্রেস।
বাংলায় মহাবিপর্যের পর যখন বিধানসভার পরিষদীয় দল যখন তাঁর হাত-ছাড়া হয় এবং সংসদীয় দলেও বিদ্রোহের আঁচ পাওয়া যায়, তখন ইন্ডিয়া জোটের শরণাপন্ন হন তৃণমূলের সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চলতি জুন মাসের ৮ তারিখ ওই বৈঠকে রাহুল গান্ধী বিরোধী ঐক্যের বার্তা দিলে তাঁকে খোঁচা দিয়ে ডিএমকে নেতৃত্ব বলেন: বিলম্বিত বোধোদয় হয়েছে তাহলে।
ওই বৈঠকের সপ্তাহখানেক বাদে, সোমবার নিজেদের মুখপত্র ‘মুরাসলি’-তে রাহুলকে নিশানা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে রাহুলের নামের আগে ‘রাজনৈতিক ভাবে অপরিণত’ ও ‘বিশ্বাসভঙ্গকারী’-র মতো চোখা-চোখা বিশেষণে বিশেষিত করা হয়। যা সর্বভারতী রাজনীতিতে বিজেপি-বিরোধী জোট রাজনীতিতে আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।
প্রসঙ্গত, জোটের অন্যতম শরিক অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টির বঙ্গ-নেতা কিরণময় নন্দ ইন্ডিয়া-র অস্তিত্ব নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেন। বামফ্রন্ট আমলের মৎস্যমন্ত্রী কিরণময়ের কথায়, “পদ্মপাতার ওপর জল যেমন থাকে, কোনদিকে কখন পড়ে যায় তার ঠিক নেই, ওই অবস্থার মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস আছে। ইন্ডিয়া জোট আছে ঠিকই, তবে নির্বাচনের সময়ে তা কাজ করে না। ৫ টা রাজ্যে নির্বাচন হয়ে গেল, কোথায় ইন্ডিয়া জোট কাজ করেছে? আজ ইন্ডিয়া জোট সোনার পাথরবাটি”।
এখানেই শেষ নয়। সুদীনে দুর্দিনে যে-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থেকে সমাজবাদী পার্টিল অখিলেশ ও কিরণময়রা, এদিন সেই মমতাকেই একহাত নেন তাঁরা। নির্বাচন কমিশনকে কার্যত সার্টিফিকেট দিয়ে কিরণময়ের দাবি, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটো জায়গাতেই হেরেছেন। আমি দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বিধানসভায় যে-ঘটনাগুলো ঘটেছিল, ভারতবর্ষের ইতিহাসে এত নক্কারজনক ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। গণতন্ত্রকে যদি কেউ ধ্বংস করে থাকে, বিধানসভার গরিমাকে যদি কেউ ধ্বংস করে থাকে, তাহলে তা তৃণমূল কংগ্রেস করেছে”।
এখানেই শেষ নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি সমাজবাদী পার্টির অবস্থান জানিয়ে কিরণময়কে বলতে শোনা যায়, “সঙ্গে আছি মানে এই নয় যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হারেননি তাঁকে হারানো হয়েছে, এমনটা আমরা বিশ্বাস করি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটো জায়গাতেই হেরেছেন। তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল, ভবানীপুরে সত্যি কী ঘটেছিল। তাঁরা বলেছেন, ভবানীপুরের মানুষই চেয়েছিল মমতাকে হারাতে। তাই উনি হেরে গিয়েছেন। অখিলেশ যাদবকেও বলছি, পশ্চিমবঙ্গে যে নির্বাচন হয়েছে, তা একদম ঠিকঠাক হয়েছে। মানুষ তার রায়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে তাড়িয়ে বিজেপিকে এনেছে”।
এমতাবস্থায়, যে-ঊনত্রিশের লোকসভা নির্বাচনকে নিজের অস্তিত্বরক্ষার শেষ লড়াই হিসেবে দেখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তা ছিন্নভিন্ন হয়ে আদৌ বেঁচেবর্তে থাকবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয়ী রাজধানীর রাজনৈতিক মহল।