ভারত চাইলেও হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে পারবে কি?
'মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে'র অভিযোগে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল। আর তারপরই শুরু হয়েছে জল্পনা, ভারত কি মুজিব-কন্যাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড সুনিশ্চিত করবে?
গতবছরের জুলাই-অভ্যুত্থানের পর দেশ ছাড়ার আগে অবধি ভারতের প্রতি বাংলাদেশের ঋণ পদে-পদে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা প্রবীণ প্রজন্মের অনেকে আজও ভোলেননি। আর সেই 'ভূমিকা' খুব সহজ ছিল না মোটেও। আমেরিকায় দাঁড়িয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্টকে সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর প্রবল সাহস আর কূটনৈতিক বুদ্ধি পাকিস্তানকে পরাস্ত করেছিল। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর ভারতের কাছে পাক সেনার তরফে জেনারেল নিয়াজি-র আত্মসমর্পণের ফটোগ্রাফে আজও এতটুকু ধুলো পড়েনি।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন একটাই, মুক্তিযুদ্ধের মুখ বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের কন্যাকে কি বাংলাদেশে মৃত্যুর মুখে ছেড়ে দেবে ভারত?
এর প্রথম উত্তর হল, কেন্দ্রে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলে এ প্রশ্ন উঠতই না। আর দ্বিতীয় উত্তর, নরেন্দ্র মোদীর সরকার চাইলেও শেখ হাসিনাকে সহজে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে পারবে না। এমনকি, দু-দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও (২০১৩ সালের চুক্তি যা ২০১৬ সালে সংশোধিত হয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার উদ্দেশ্যে)।
কেন?
ওই চুক্তির ভিতরেই রয়েছে এই 'কেন'র উত্তর।
প্রথমত, কাউকে প্রত্যর্পণ করার আগে জানতে হবে তাঁর বিরুদ্ধে ঠিক কী-কী অভিযোগ রয়েছে। আর, সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে কি না। যদি মনে হয়, বিচার হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, তাহলে অঙ্কুরেই বিনাশ হবে প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া।
দ্বিতীয়ত, বিচারে রাজনৈতিক রং লাগেনি বলে দাবি করে যাবতীয় নথিপত্র তুলে দেওয়া হলেও, ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এক নিবিড় পর্যালোচনা শুরু করবে। সেখানে দেখা হবে, প্রত্যর্পণ চুক্তির কোনও শর্ত অমান্য করা হয়েছে কি না। সেইসঙ্গে দেখা হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে চার্জ গঠন করা হয়েছে, তা দু-দেশের কাছেই 'অপরাধ' কি না। সেই সঙ্গে দেখা হবে, ওই চার্জ, রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় 'অপরাধে'র আওতায় ছাড় পায় কি না। যদি পায়, তাহলে তা প্রত্যর্পণের আর্জি খারিজ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট।
তৃতীয়ত, এই পর্যায়ে শুধু বিদেশ মন্ত্রক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পর্যালোচনাই শেষ কথা বলবে, তা কিন্তু নয়। এই প্রত্যর্পণের আইনি দিক, এই প্রত্যর্পণের আবেদন যথাযথ কি না, তার বিচার শুরু হবে বিশেষ প্রত্যর্পণ আদালতে। প্রত্যর্পণের সুযোগে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা-ও ভালো করে খতিয়ে দেখবে এই বিশেষ আদালত।
চতুর্থত, এই প্রত্যেকটি ধাপ পেরিয়ে এলেই যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা হবে, তা কিন্তু নয়। এর পরেও একাধিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। স্থানীয় পুলিস বা ঊর্ধ্বতন কোনও কর্তৃপক্ষের তরফে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে। পরোয়ানা জারি হওয়ার পর ভারত সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিরাপদ কোনও জায়গায় 'আটক' করে রাখবে। আর যতক্ষণ-না পর্যন্ত প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার আইনি খুঁটিনাটি সম্পূর্ণ হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই নিরাপত্তার বলয়ে থাকতে পারবেন তিনি।
চূড়ান্ত পর্যায়ে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা শেখ হাসিনাকে সশরীরে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হবে ঠিকই। তবে, সে ক্ষেত্রেও বেশ কিছু আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতি মেনে চলতে হবে। কোনও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা আন্তর্জাতিক সীমান্তে এই প্রত্যর্পণ হবে। এ ক্ষেত্রে দুরকম সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের কোনও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিশেষ বিমানে হাসিনাকে ঢাকা বিমানবন্দরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। অথবা, পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত থেকে হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে।
এই যাবতীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পরও একটা 'কিন্তু' থেকে যায়। আর সেই 'কিন্তু' হল, হাসিনা যেহেতু একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেহেতু সেখানে অবধারিতভাবে 'রাজনীতি' ঢুকে পড়বে। যা এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে আরও বিলম্বিত করে তুলবে। তাছাড়া, কোনও অর্থনৈতিক অপরাধী বা সন্ত্রাসবাদীর প্রত্যর্পণ যত সহজে সম্ভব হয়, সদ্য প্রাক্তন হওয়া কোনও রাষ্ট্রপ্রধানের প্রত্যর্পণ অত সহজ হয় নয়। ভারতে নিরাপদ আশ্রয় চেয়ে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর আর্জি, পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মহলের চাপও কাজ করতে পারে। হাসিনা নিজের দেশে 'মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী' হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হলেও তাঁর বিচারপ্রক্রিয়া ত্রুটিমুক্ত নয়। এমতাবস্থায়, অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের চাপও কাজ করবে ভালোরকম।