আইপ্যাক-ইডির সংঘাত সুপ্রিম কোর্ট অবধি গড়িয়েছে। এবং নজিরবিহীনভাবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে অভিযোগ করে হলফনামা পেশ করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। এমতাবস্থআয় পর্যবেক্ষকরা তাকিয়েছিলেন, শীর্ষ আদালতে যুযুধান দু-পক্ষের দ্বৈরথে কোন পক্ষ জেতে, কোন পক্ষ হারে। কিন্তু, অল্প সময়ের ব্যবধানে যেভাবে দু-দুবার শুনানি পিছিয়ে গেল, তাতে করে রাজনৈতিক মহলে ফের সেই প্রশ্ন উঠল: 'সেটিং সত্য জগৎ মিথ্যা'?
কেন পিছলো মামলা?
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি পি কে মিশ্র ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চে যখন শুনানি শুরু হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই একজন 'জুনিয়র' আইনজীবী এসে আবেদন জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী কপিল সিব্বাল অসুস্থ, তাই শুনানির দিন পিছনো হোক। ওই আইনজীবী নিজেকে সিব্বালের 'জুনিয়র' বলে দাবি করেন। এমতাবস্থায়, কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা একবাক্যে শুনানি পিছনোর আবেদন মেনে নেন।
ডিএ মামলায় সিংভি-র কৌশল
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ মামলা রহস্যজনকভাবে ঠান্ডা ঘরে পড়েছিল দীর্ঘদিন ধরে। ওই সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন চন্দ্রচূড়। প্রসঙ্গত, আরজিকরকাণ্ডে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করে যিনি পুরো বিষয়টি ঘেঁটে দেন বলে অভিযোগ, ডিএ মামলাতেও সেই চন্দ্রচূড়ের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে। পরে যখন মামলাটির শুনানি হয় ও তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়, তখন রাজ্যের আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি একদিন আচমকা এজলাসে এসে বলেন, তিনি অন্য এজলাসে অন্য একটি মামলার সওয়াল করছেন, তাই শুনানির জন্য অন্য একটি ঠিক করা হোক। আদালতও সেই দাবি মেনে নেয়।
ইডি বনাম মমতা
চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি, ভোটের আলো ফুটতে-না-ফুটতেই তৃণমূলের ভোট-পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকে হানা দেয় ইডি। কয়লাপাচার সংক্রান্ত মামলার তদন্তে, প্রথমে লাউডন স্ট্রিটে সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে, পরে, সেক্টর ফাইভের গোদরেজ ওয়াটার সাইডে সংস্থার দফতরে তল্লাশি অভিযান চলে। এমতাবস্থায়, নজিরবিহীনভাবে তল্লাশি চলাকালীন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দুই জায়গাতেই পৌঁছে যান। এবং ইডি-র অভিযোগ, ফাইল থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন পর্যন্ত ছিনিয়ে নেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে, হাইকোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় ইডি। আইপ্যাক-তল্লাশির সময়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়। সেই মামলায় রাজ্য পুলিসের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ডিজি রাজীব কুমার থেকে শুরু করে কলকাতার সদ্য প্রাক্তন পুলিস কমিশনার মনোজ ভার্মার নাম উল্লেখ করা হয়। রাজ্যের নবনিযুক্ত মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী-সহ বেশ কয়েকজন আমলার নামও থাকে। ওই দিনের ঘটনায় সিবিআই তদন্ত চেয়ে আবেদন করে ইডি। এমতাবস্থায়, সুপ্রিম-কোর্টে মামলাটি ওঠে এবং প্রত্যাশিতভাবেই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়। মঙ্গলবার সেই মামলার শুনানিতে, ইডি রীতিমতো রহস্যজনক আচরণ করে। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাত্র ১৯ পাতার যে-হলফনামা দিয়েছেন, তার প্রেক্ষিতে দু-সপ্তাহ সময় চায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আইনজীবী মহলের বক্তব্য, আইপ্যাককাণ্ডে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এতদিন যা বলে আসছিলেন, মোটের উপর সেই কথাই ওই হলফনামায় রয়েছে। কিন্তু, তার জন্য কেন অতিরিক্ত সময় চেয়ে মামলা পিছিয়ে দিতে চাইল ইডি ও কেন্দ্র! এই মামলায় হাইকোর্টে হট্টগোল থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের সওয়ালে, সর্বত্র রাজ্যের আইনজীবীরা চাইছিলেন, মামলা যাতে পিছিয়ে যায়, তারিখ-পে-তারিখ চলতে থাকে। অন্যদিকে ইডি চেয়েছিল জরুরি ভিত্তিতে শুনানি। এমতাবস্থায়, মঙ্গলবার ইডি-র পশ্চাদপসরণের রহস্য উদঘাটনে সেটিং তত্ত্ব-র দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় কী? প্রশ্ন ওঠে পর্যবেক্ষক মহলে।
আইনজীবী মহলের একাংশ মনে করছে, কপিল সিব্বাল যদি অসুস্থ হন, তাহলে বাড়ি বসে ভার্চুয়াল শুনানিতে অংশ নিতে পারতেন তিনি। কিন্তু, তা না-করে, নিজের জুনিয়রকে পাঠিয়ে শুনানি পিছনোর আর্জি আদতে মামলা পিছনোর কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। ডিএ মামলায় সিংভি যে চাল চেলেছিলেন, এদিন কার্যত সেই চালেই শুনানি-পিছনোর আর্জি জানিয়ে মাত করলেন কপিল সিব্বাল।