হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলির মধ্যে একটি। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন হয়। পারস্য উপসাগর থে...
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলির মধ্যে একটি। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন হয়। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান দ্বার এটি। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই প্রণালী মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া স্থানে সবচেয়ে সংকীর্ণ, যা যেকোনো সংঘাতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তোলে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের উপর সামরিক হামলা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রণালীটিকে কার্যত বন্ধ করে দেয়। ড্রোন, মিসাইল হামলা, মাইন স্থাপনের হুমকি এবং জাহাজ আটকের ঘটনায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি ট্যাঙ্কার চলাচল করলেও বর্তমানে তা মাত্র কয়েকটিতে সীমাবদ্ধ। অনেক জাহাজ আটকে পড়েছে, বীমা কোম্পানিগুলি যুদ্ধ-ঝুঁকির কভারেজ বাতিল করেছে, ফলে বৈশ্বিক তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে।
ইরানের অবস্থান স্পষ্ট—প্রণালীটি খোলা রাখা হয়েছে, কিন্তু শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জাহাজের জন্য নিষিদ্ধ। ভারত, চীন, তুরস্ক, রাশিয়ার মতো দেশের জাহাজকে সীমিতভাবে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, এটি শত্রুদের উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল। অন্যদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ঘোষণা করেছেন, প্রণালী বন্ধ রাখা হবে শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে।
এই পরিস্থিতির ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং অনেক দেশে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন দেশকে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে প্রণালী নিরাপদ করার আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু এখনও পূর্ণ উন্মুক্ততা ফিরে আসেনি।
হরমুজ প্রণালীর এই সংকট দেখিয়ে দেয় যে, বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর। এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়, সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। শান্তি ও কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ পথের নিরাপত্তা ফিরে আসা কঠিন।