প্রায় তিরিশ ঘণ্টার তল্লাশি। বেরিয়ে এল তাল তাল সোনা, আর বান্ডিল বান্ডিল নোট। টাকার পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ। আর সোনা ১৫ কেজি। যদিও, সরকারি আইনজীবী বলছেন, এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। শুক্রবার নবান্নে রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা এবং স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্গমিত্রা ঘোষকে পাশে বসিয়ে সেই পরিসংখ্যানই বিশদে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, স্রেফ রাজ্যের একটি জেলা থেকেই বেআইনি ভাবে পাথর পাচার করে গত ১৫ বছরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
নগদ অর্থ থেকে সোনা এবং গাড়ির ব্যালেন্স শিটঃ
বীরভূমের পাথরসম্রাট টুলু মণ্ডল এবং তাঁর শ্যালক মিনার মণ্ডলের কাছ থেকে পুলিশ যা যা পেয়েছে তা হল—
নগদ ও অলঙ্কার: মিনার মণ্ডলের ডেরা থেকে উদ্ধার হওয়া নগদ ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা এবং ১৫ কেজি সোনা (যার মোট বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা) ছাড়া পরবর্তীতে আরও ৫৩ লক্ষ টাকা নগদ, ২৬৮ গ্রাম সোনার গয়না, ৪০০ গ্রাম রূপো এবং ২৩ গ্রাম প্ল্যাটিনামের গয়না মিলেছে।
অ্যাাকাউন্ট ফ্রিজ: ফেরার ‘পাথরসম্রাট’ টুলু মণ্ডলের সন্ধান পাওয়া এ যাবৎ ৯৩ কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স চিহ্নিত করে সমস্ত অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে।
যানবাহন ও সম্পত্তি: রাজকীয় বিলাসের অঙ্গ হিসেবে বিএমডব্লিউ, অডি এবং ৮৩টি ডাম্পার-ট্রাক-সহ মোট ২৪২টি গাড়ি সিজ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩টি পাথর খনি, ২টি ক্রাশার, ২টি পেট্রোল পাম্প, ১টি ফার্মহাউস, ৭টি প্রকাণ্ড বাড়ি-সহ মোট ২১টি স্থাবর সম্পত্তি (যার মোট আয়তন প্রায় ৩০০ বিঘা) আইনি প্রক্রিয়ায় বাজেয়াপ্ত করার কাজ চলছে।
নথি ও সরঞ্জাম: নগদ গণনার ৩টি যন্ত্র, ১টি কম্পিউটার, ২টি পেন ড্রাইভ এবং বিপুল পরিমাণ ভুয়া ডিসিআর, রোড চালান ও চেক বই উদ্ধার হয়েছে।
অভিযানের সাফল্যের জন্য বীরভূমের পুলিশ সুপার, জেলা পুলিশ টিম এবং ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানোয় রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পূর্বে বীরভূমের পাথর খাত থেকে রাজ্য সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আসত মাত্র ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা। অথচ নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র এক মাসে (১১ মে থেকে ১১ জুন) সেই আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ১০০ কোটির কোঠা ছুঁইছুঁই। প্রতি বছর ১০০ কোটি টাকা সরকারি খাতায় জমা পড়লেও প্রায় ১০০০ কোটি টাকা কালো পথে বাইরে বেরিয়ে যেত। গত ১৫ বছরে শুধু বীরভূমের পাথর খাত থেকেই রাজ্যের অন্তত ১৫,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব চুরি হয়েছে। এই বিপুল অর্থ সরকারি তহবিলে এলে আরও নতুন হাসপাতাল তৈরি হত, নতুন স্কুল বিল্ডিং হতো, লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থান হতে পারত।”
প্রশাসনিক কঠোরতার উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, পূর্ব বর্ধমানে তৃণমূল নেতাদের ফেলে রাখা বেআইনি বালি প্রকাশ্যে নিলাম (অকশন) করে এক লপ্তে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা রাজ্য কোষাগারে যুক্ত করেছে নতুন সরকার।
আইনশৃঙ্খলা ও রাজ্য প্রশাসনের এই রদবদল প্রসঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি নিশানা করেন শুভেন্দু। বলেন, ২৪২টি বিলাসবহুল গাড়ি বা ৩০০ বিঘা জমি এক দিনে কেনা সম্ভব নয়। রেজিস্ট্রি অফিস, মোটর ভেহিক্যালস, স্থানীয় পঞ্চায়েত, ল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট ও খনিজ কর্পোরেশনের একাংশের মদত ছাড়া এই ব্যবস্থা চলতে পারে না।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, “প্রতিষ্ঠান প্রধানের সম্মতি ছাড়া এত বড় অসাধু র্যাকেট বছরের পর বছর চলতে পারে না। ‘মিস্টার মণ্ডল আমাদের লোক, ওর দিকে তাকাবে না’— শীর্ষ স্তর থেকে এমন নির্দেশ ছিল বলেই নিচুতলার আধিকারিকরা চোখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাই এর দায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ওপরেই বর্তায়।”
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মামলা রুজু করে ইতিমধ্যে মূল অভিযুক্ত মিনার মণ্ডলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি, মূল হিসাবরক্ষক (অ্যাকাউন্টেন্ট) পিনাকী দে, সহ-হিসাবরক্ষক রাকিবুল ইসলাম এবং পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার কাউসারসহ মোট ৫ জনকে ডিটেন করে জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছে পুলিশ। অসদুপায়ে উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি, সিআইডি ও এসটিএফ-এর প্রযুক্তিগত সাহায্য নেওয়া হচ্ছে বলে জানান শুভেন্দু।