৩৪ বছরের বাম সরকারকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি। শুধু বাংলা নয় দেশের রাজনীতিতেও বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে থেকেছেন। কালীঘাট থেকে মহাকরণ, তাঁর রাজনীতির গোটা জার্নিটা ছিল বর...
৩৪ বছরের বাম সরকারকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি। শুধু বাংলা নয় দেশের রাজনীতিতেও বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে থেকেছেন। কালীঘাট থেকে মহাকরণ, তাঁর রাজনীতির গোটা জার্নিটা ছিল বর্ণময়। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সকলের প্রিয় দিদি। ২০১১-র পরিবর্তন সেই সময় শুধু রাজনৈতিকই নয়, সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। তারপরে কেটে গেছে ১৫ টা বছর, মাঝে দুটো বিধানসভায় বিরোধীদের কুপোকাত করে বিরাট ব্যবধানে জয়, লোকসভা সহ পঞ্চায়েত, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিটা পূজায় কেটেছে বেশ ব্যস্ততায়। তারপর ২০২৬ সাল, গেরুয়া শিবিরের কাছে ধরাশায়ী তৃণমূল, দুর্নীতিতে জর্জরিত দলটির থেকে মুখ ফিরিয়েছেন বাংলার ভোটাররাও, ক্ষমতাচ্যুত হলেন মমতা। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যে নেত্রী মহালয়া থেকে শুরু করে ষষ্ঠী পর্যন্ত কলকাতার শত শত মণ্ডপ চষে বেড়াতেন, যাঁর হাত ধরে শুরু হত বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসবের উন্মাদনা, ক্ষমতা হস্তান্তরের পর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পুজো কেমন কাটছে?
২০১১-র পরে বাঙালির দুর্গাপূজা, উৎসবের আমেজেও কিছুটা পরিবর্তন এল। উৎসবের শুরু, জাঁকজমক, ষষ্ঠী থেকে এগিয়ে চলে গেল পঞ্চমী, চতুর্থী। শেষ কয়েক বছরে পূজা শুরুই হত মহালয়ার দিন থেকে। তারপর দশমী, কার্নিভাল, দুর্গাপূজা 'মাস আর্ট', সনাতনী এই উৎসব হয়ে গেল কর্পোরেট। বিগত বছরগুলোতে মহালয়ার দিন বা পিতৃপক্ষেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুজো উদ্বোধন শুরু করে দিতেন। চেতলা অগ্রণী, সুরুচি সংঘ, শ্রীভূমি কিংবা জোধপুর পার্কের মতো হাই-প্রোফাইল পুজো মণ্ডপে সশরীরে উপস্থিত থেকে তিনি দেবীর 'চক্ষুদান' করতেন, আবার কখনও ভার্চুয়ালি জেলার পুজোর ফিতে কেটেছেন। পুজো কমিটিগুলোর উদ্দীপনা আর সাধারণ মানুষের ভিড়ে মধ্যমণি ছিলেন ম্যাডাম বন্দ্যোপাধ্যায়।
কিন্তু কথায় আছে ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়। ২০১১ সালের পরে ২০২৬-এ বাংলা ফের একবার দেখল ক্ষমতা হস্তান্তর। বিজেপি এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে পরিবর্তন এসেছে বাঙালির উৎসবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একটি পূজা উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেন, 'কেউ বা কারা দুর্গাপুজোকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিণত করেছেন। সেটা করবেন না। সনাতন হিন্দু ধর্ম মেনে পুজো করা হবে।' কালের নিয়মে পরিবর্তন হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারপাশের। অনুরাগী, স্তাবকদের ভিড় কমেছে। দল ভেঙে যাওয়ার পরে কালীঘাটে কমেছে নেতা-নেত্রীদের আনাগোনা। এ প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 'যান ওনাকে গিয়ে বলুন আড়াই হাজার পুজো উদ্বোধন করে আসুক এখন।'
তাঁর কালীঘাটের ঠিকানায় আগের মতো হাজারো আমন্ত্রণের পাহাড় নেই। শহর বা জেলার বড় কোনো পুজো মণ্ডপে উদ্বোধক বা প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁর উপস্থিতিও চোখে পড়েনি। তাই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবারের পুজোয় তাঁর ব্যস্ততা অনেকটাই কমেছে। মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহলের খবর অনুযায়ী, পুজো শুরুর ঠিক আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেও কিছুটা 'মন খারাপ' হওয়ার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তবে কালীঘাটেরই একটি স্থানীয় পুজো উদ্বোধনে দেখা গেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ক্ষমতার শীর্ষে থাকার সময় মণ্ডপে মণ্ডপে, গোটা শহর জুড়ে যাঁর ছবি আর ব্যানার শোভা পেত, ২০২৬ সালে সেই সবকিছুই একেবারে স্তিমিত। হয়ত এবারের দুর্গাপূজা তাঁর জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতা, যা তাঁর বিগত ১৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ব্যস্ততম পুজোর দিনগুলোর থেকে একেবারেই আলাদা।