প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে এবার নজরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত সংস্থা ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’। চাকরি বিক্রি ও ঘুষের কোটি কোটি টাকার লেনদেনের উৎস খুঁজতে গিয়ে এই সংস্থার আর্থিক নথি, ব্যাঙ্ক লেনদেন এবং সম্পত্তির খতিয়ান তলব করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।
সোমবার প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। কিছু প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি বলেও অভিযোগ। যদিও এই দাবি খারিজ করে অভিষেক জানিয়েছেন, তিনি তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। ভবানী ভবন থেকে বেরিয়ে তাঁর বক্তব্য, "সকাল ১১টার আগেই আমি উপস্থিত হয়েছিলাম। প্রায় ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ হয়েছে। এর আগেও বহুবার ডাকা হয়েছে, প্রতিবারই হাজির হয়েছি। আমার সামর্থ অনুযায়ী সবরকম সহযোগিতা করেছি।"
এই তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি ১৫ মিনিটের অডিও রেকর্ডিং। ইডির তৃতীয় অতিরিক্ত চার্জশিটে এই অডিওর উল্লেখ রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ২০১৭ সালে বেহালায় 'কালীঘাটের কাকু' নামে পরিচিত সুজয়কৃষ্ণ ভদ্রের বাড়িতে হওয়া এক বৈঠকের কথোপকথন এটি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কুন্তল ঘোষও।
তদন্তকারী সূত্রে দাবি, ওই কথোপকথনে চাকরি বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল অঙ্কের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা ও বিবাদের ইঙ্গিত রয়েছে। সেখানে উঠে এসেছে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নামও। অভিযোগ, অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। এমনকি ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা এবং সেই টাকার একটি অংশ বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে বণ্টনের কথাও উঠে এসেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। ইতিমধ্যেই এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কুন্তল ঘোষ। অডিও রেকর্ডিংয়ের সত্যতা যাচাই করতে সুজয়কৃষ্ণের কণ্ঠস্বরের নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেই সূত্র ধরেই এবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেরা করা হয়েছে বলে তদন্তকারী মহলের দাবি।
তবে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য স্পষ্ট— এই তদন্তে তিনি বারবার সহযোগিতা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও আইন মেনে করবেন। যদিও ইডি সূত্রে খবর, তলব করা নথি ও আর্থিক তথ্য খতিয়ে দেখার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তাঁকে ফের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হবে কি না। ফলে নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’-এর আর্থিক নথি কি নতুন কোনও তথ্য সামনে আনবে? নাকি এই তদন্ত আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতের পথ খুলে দেবে? বাংলার রাজনীতিতে সেই উত্তরই এখন সবচেয়ে বেশি চর্চার বিষয়।