ভোটের দুদিন আগে থেকে সংশ্লিষ্ট বিধানসভা এলাকায় বাইকের উপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল নির্বাচন কমিশন। হাইকোর্টে এর বিরুদ্ধে মামলা হয় ও আদালত কমিশনকে ভর্ৎসনা করে। এবং, বাইকের উপর বিধিনিষেধ শিথিল করতে বাধ্য হয় কমিশন।
এমতাবস্থায়, রবিবাসরীয় সকালে বাইকবাহিনীর দাপট প্রতিহত করতে রণনীতি পাল্টাল নির্বাচন কমিশন।
'ভয়ঙ্কর খেলা'র হুমকি
এদিন সকালে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করা হয় কমিশনের তরফে। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ও শোনা যাচ্ছে, রাতের বেলায় কোনও এক তল্লাটে বাইক-বাহিনী হুমকি দিতে-দিতে চলে যাচ্ছে, "ভয়ঙ্কর খেলব ৪ তারিখ"। প্রসঙ্গত, ৪ মে ভোটের ফল গণনা। হুমকির উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট, দ্বিতীয় দফায় ভোট দিতে গেলে অথবা 'তাদের'কে ভোট না-দিলে ফল ঘোষণার পর ভয়ঙ্কর পরিণতি হবে!
কমিশনের দাবি, শনিবার রাত ৯ টা ৫০ মিনিটের ওই ভিডিয়োটি ডায়মন্ড হারবার এলাকার অন্তর্গত। সিসিটিভি ফুটেজের উপর ভিত্তি করে ডায়মন্ড হারবার থানায় এফআইআর করা হয়।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এফআইআর নিমিত্ত মাত্র, বাংলায় ভোটের আগে বাইক বাহিনী কীভাবে তাণ্ডব চালায়, এই ভিডিয়ো প্রকাশ করে কার্যত হাইকোর্টকেও বার্তা দিল কমিশন।
ভোটের দিন কমিশনের 'বাইক বাহিনী'
এদিন, কমিশন-কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরনোর পর কলকাতার পুলিস কমিশনার অজয় নন্দ সাংবাদিকদের জানান, ১৬০ টা মোটরবাইক টহলদারি দেবে ভোটের দিন (২৯ তারিখ)। প্রতি টহলদার টিমে ৩ থেকে ৪ টে মোটরবাইক থাকবে। এবং, প্রতি বাইকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর একজন করে জওয়ানও থাকবেন। সঙ্গে থাকবেন কলকাতা পুলিসের কর্মী-আধিকারিকরা। যাঁরা অলিগলি চিনিয়ে দেবেন।"
পর্যবেক্ষকরা হিসেব করে দেখছেন, ১৬০ খানা টহলদারি দলে যদি তিন-চারটে করে বাইক থাকে, তাহলে বলা যেতে পারে, মোটের উপর শ-পাঁচেক বাইক কলকাতা দাপিয়ে বেড়াবে ভোটের দিন। এবং, কমিশনের এই বাইকবাহিনীর সামনে রাজনৈতিক দুষ্কৃতীদের বাইকের হাওয়া খুলে যেতে বেশি সময় লাগবে না।
অলিগলি পাকস্থলি
কলকাতার সর্প-সদৃশ অলিগলিতেও নজর থাকবে কমিশনের। যে কারণে, বুথপিছু ২ টি সিসি ক্যামেরা ছাড়াও আরও অসংখ্যা ক্যামেরার চোখ থাকবে অলিগলির পাকস্থলির দিকে। কলকাতার পুলিস কমিশনার অজয় নন্দ-র কথায়, "ভোটারদের একটাই বার্তা, ভয়মুক্ত হয়ে ভোট দিন"।
'অহিংস ও ভয়শূন্য' ভোট
দুদিনের বঙ্গসফরে এসে, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেছেন, "রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের তপোভূমিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন আবারও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ভোটারকে বার্তা দিতে চায়, নির্বাচন হবে অহিংস (Violence Free) এবং ভয়শূন্য (Intimidation Free)"। পর্যবেক্ষকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্বিতীয়টির উপর। যে-চোখরাঙানি চোখে দেখা যায় না, যে-হুমকি কানে শোনা যায় না, একেবারে ঠিক সেই জায়গাতেই জোর দিয়েছেন তিনি: 'ইন্টিমিডেশন ফ্রি (Intimidation Free)'। বুথের ভিতর যতটা নজর কমিশনের, ঠিক ততটাই নজর বুথের বাইরে। রাজ্যের আমলা ও পুলিস কর্তাদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার, শুধু ভোটের দিন কোথাও কোনও রক্তপাত হবে না, তা নয়, 'নিঃশব্দ অদৃশ্য সন্ত্রাস'ও এবার আর বরদাস্ত করা হবে না। রাজ্যের এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে ধমক দিয়ে তিনি বলেছেন, "সব জানি, বসুন"। বেশ কয়েকজন জেলাশাসককে সতর্ক করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, সব কাজের 'ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট' রয়েছে ও রয়ে যাবে, তাই, বেচাল দেখলে ভোট-পর্ব শেষ হওয়ার পরেও পদক্ষেপ করবে কমিশন।
বুথের ত্রিসীমানায় থাকবে না পুলিস
শুরুতেই কমিশন জানিয়েছিল, ভোটের দু-দফাতেই বুথের রাশ থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে। এবং, ত্রিসীমানায় থাকবে না রাজ্যের পুলিস। জানিয়ে দিয়েছে কমিশন।কমিশন-সূত্রে খবর, যেহেতু বারংবার রাজ্যের পুলিসের বিরুদ্ধে শাসকদলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠছে, তাই এবার বুথের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে। বুথের বাইরে ভোটারদের নথি যাচাইয়ে বিএলও-র সঙ্গে থাকবেন বাহিনীর জওয়ানরাও। ভিতরেও থাকবেন জওয়ানরা। বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে সবকিছু তদারক করবে কেন্দ্রীয় বাহিনী। এবং, রাজ্যের ৮০ হাজার ৭১৯ টি বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে কোথাও থাকবে না রাজ্যের পুলিস!
বাংলার 'ভোট কালচার' বদলাবে?
বাংলার 'ভোট কালচার' যে এবার পাল্টাবে তার আগাম ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্তের কথায়। কালীঘাট থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, "(ভোট) কালচার মানে কি বিজেপির ডান্স করা? উনি (সুব্রত গুপ্ত) এখানকার কালচার কী চেঞ্জ করবেন? বেঙ্গলের কালচার, বাংলার কালচার, বাংলাতেই থাকবে। উনি নিজের কালচার ঠিক করুন আগে"।
পরে যখন সাপ্লিমেন্টারি তালিকা নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে যখন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে বাংরবার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তার উত্তরে তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন: ভোট এবার অন্যরকম হবে।
কীরকম ভোট হবে এবার?
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছিলেন, বুথের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানের হাতে। তাই ইভিএমে সেলোটেপ (হামেশাই যে-অভিযোগ ওঠে), ওয়েবকাস্টিং ক্যামেরায় চুইংগাম লাগানো সহজ হবে না"। বাহিনীকে তো পুলিস নিয়ন্ত্রণ করবে, তাহলে? এবার আরও স্পষ্ট উত্তর, "পুলিসের কাজ হবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সহায়তা করা। বুথের নিয়ন্ত্রণ আর পুলিসের হাতে থাকবে না। যাঁরা সীমান্তে সর্বদা পাহারা দিচ্ছেন, সেই জওয়ানদের কাছে একটা বুথ নিয়ন্ত্রণ করা কোনও ব্যাপারই নয়"। প্রসঙ্গত, প্রথম দফায় ২ লক্ষের বেশি বাহিনীর জওয়ান ও আধিকারিক ভোটের দায়িত্বে থাকবেন। দ্বিতীয় দফাতেও প্রায় একই সংখ্যক বাহিনীর নজরদারিতে ভোট হবে।
বেচাল দেখলেই পপ আপ দেবে এআই
কমিশন এবার এতটুকু বেচাল দেখলে সংশ্লিষ্ট বুথের ভোট খারিজ করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেবে। রাজ্যের সিইও-র কথায়, "আগে রিপোল (পুনর্নির্বাচন) ছিল এক্সসেপশন, এবার এতটুকু সন্দেহ থাকলেই পুনর্নির্বাচন হবে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট সুনিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন এবার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বুথের ভিতর চারজনের বেশি প্রবেশ নিষেধ। রাজ্যের ৮০ হাজার বুথের কোনও একটিতে যদি চারজনের বেশি লোক ঢুকে পড়ে, তাহলে সঙ্গে-সঙ্গে পপ-আপ দেবে এআই। সেই পপআপ দেখলেই তৎদণ্ডে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কমিশনের আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে চলে যাবেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীও দ্রুত পদক্ষেপ করবে। প্রত্যেক বুথের অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ, গুগল ম্যাপ, প্রিসাইডিং অফিসার, সব রয়েছে (সফটওয়্যারে)"। এরপর কমিশনের সাবধানবাণী, "কেউ গন্ডগোল করলে নিজের দায়িত্বে করবে"।