তাঁর প্রস্থান সময়ের অপেক্ষা ছিল মাত্র। এদিন দুপুরে সেই অপেক্ষাটুকুও ফুরল।
যে-মহানগরের মহানাগরিক ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, যে-পৌরসভার মেয়রের চেয়ার অলঙ্কৃত করেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, এদিন দুপুরে ঠিক সেই চেয়ারের মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে এলেন ফিরহাদ হাকিম। এবং দাবি করলেন, তিনি আর এই চেয়ারের মর্যাদা রাখতে পারছেন না।
জনাব ফিরহাদ হাকিমের মনে হঠাৎ এহেন মহাচৈতন্যের উদয় হল কেন?
প্রশ্নটি কঠিন। স্বভাবতই, উত্তরটিও কঠিন। এমতাবস্থায়, কল্পনার আকাশের দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষকরা জল্পনা তৈরি করছেন। এক-এক করে। এবং, তারপর তা বাজারে ছাড়ছেন।
ছাব্বিশের বিধানসভায় তৃণমূলের মেগা-বিপর্যয়ের পর দেখা গেছে, কলকাতা পৌরসভার অন্তর্গত বেশিরভাগ ওয়ার্ডেই ঘাসফুল ফোটেনি, পদ্ম ফুটেছে। তাই নৈতিক দায় নিয়ে ফিরহাদ হাকিমের এই পদত্যাগ।
কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠছে, গো-হারান হারার পরও ফিরহাদের মহানেত্রী যখন বলছেন, ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, তখন ফিরহাদ খামোকা কেন পরাজয়ের নৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করতে যাবেন?
কেউ বলছেন, ওই যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে নোটিস পাঠাচ্ছে কলকাতা পৌরসভা আর ফিরহাদ সেখানে থেকেও কিছু করে উঠতে পারছেন না, তা একেবারেই না-পসন্দ তাঁর মহানেত্রীর। যে-অভিষেকের জন্য তৃণমূলের তাবড় নেতানেত্রীদের স্ট্যান্ডিং ওভেশন (চালু কথায়, কান না-ধরে দাঁড়ানো)-র নির্দেশ দেন নেত্রী, তাঁর সেই রাবীন্দ্রিক 'শান্তিনিকেতন'-এ বেআইনি নির্মাণ ভাঙার নোটিস দেওয়ার দুঃসাহস পায় কী করে পৌরসভা!
পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন এই প্রসঙ্গে ফিরহাদের সেই মন্তব্যের কথা, "আমি কারুর ইজারা নিইনি"। তার মানে? যাঁর জমিদারিতে বাস করছেন, তাঁর ইজারা নেবেন না? এত বড় কথা? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মহানেত্রী তাঁর শরীরী-ভাষা আর মুখের কথা দিয়ে অন্তত তেমনটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর ভবানীপুরের সেনাপতিকে।
শুধু কি তাই? যে নেত্রীর মধ্যে প্রাক্তন কমরেড ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় লেনিনকে দেখেছিলেন, আর কিছুদিন 'বারোঘর এক উঠোনে থাকলে হয়তো-বা শোনা যেত, মমতাই এ যুগের রোজা লুক্সেমবার্গ, সেই মহানেত্রীকে ভবানীপুর থেকে জেতাতে ব্যর্থ হয়েছেন ফিরহাদ!
এমনই সব এক ও একাধিক কারণে, ভবানীপুরে নিজের সেনাপতির উপর ক্রমশ ক্ষুণ্ণ হচ্ছিলেন মহানেত্রী। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আর কোনও কারণে নয়, স্বয়ং নেত্রীর বিরাগভাজন হওয়ার পর আর মান-সম্মান নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না ফিরহাদের পক্ষে। অতএব, পদত্যাগই শ্রেয়।
আরও কিছু জল্পনা ঘুরে বেড়াচ্ছে বাজারে, দোকানে। তিলজলা, তোপসিয়া থেকে শুরু করে ওয়ার্টগঞ্জ, মেটিয়াবুরুজ অবধি অজস্র যেসব বেআইনি নির্মাণ হয়েছে, তার দায় ঝেড়ে ফেলা সম্ভব ছিল না ফিরহাদের পক্ষে। তৃণমূল নেতারা কোটি-কোটি টাকা কামিয়েছেন এই বেআইনি নির্মাণের সৌজন্যে। যদি ধরেও নেওয়া যায়, ফিরহাদ কোনওভাবে এর থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হননি, তাতেও গল্প শেষ হয় না। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার যেভাবে বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে শুরু করে দিয়েছে এবং তার ফলে সেই সব বাড়ির বাসিন্দারা যেভাবে ঘাসফুল নেতাদের নাম সামনে আনছেন, তার দায় অস্বীকার করতে পারেন না ফিরহাদ। অথচ, টক-টু মেয়র অনুষ্ঠানে এই ধরনের অনেক অভিযোগ পাওয়ার পর ফিরহাদকে বারংবার বলতে শোনা গিয়েছে, কাউন্সিলর কিছু জানে না, পুলিস টাকা খেয়ে এইসব বেআইনি নির্মাণ করতে দেয়। আগ বাড়িয়ে কাউন্সিলরদের হয়ে ব্যাট করতে গিয়ে মেয়র হিসেবে ফিরহাদ তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন।
আর?
ফিরহাদ বড় ক্লান্ত। পুর-নিয়োগ দুর্নীতিতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তাঁর বাড়িতে ঢুকে সকাল থেকে রাত অবধি তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে। অভিযান শেষে সাংবাদিক বৈঠক করে, বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য় ও সুজন চক্রবর্তীর উদ্দেশে ফিরহাদকে প্রশ্ন করতে শোনা গিয়েছে, "বলুন আমি কি চোর? আই অ্যাম আ থিপ?"
তখন থেকেই ফিরহাদ ক্লান্ত হতে শুরু করেছেন। নইলে, সততার প্রশ্নে বাম-নেতাদের সার্টিফিকেট প্রয়োজন হত না তাঁর। আর এখন তো অবস্থা আরও খারাপ। বাজারে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, দুবাইয়ে ফিরহাদ-কন্যার নাকি বহু হোটেল-রেস্তোরাঁ রয়েছে।
অভিযোগ সত্যি হোক কি মিথ্যা, আদ্যোপান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত দলের অন্যতম মুখ হয়ে, ফিরহাদ না-পারছেন নিজের হয়ে ব্যাট করতে, না-পারছেন মেয়ের হয়ে ব্যাট করতে। কারণ, তৃণমূলের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন শূন্যের চেয়েও নিচে।
অতএব, যেটুকু মান-সম্মান অবশিষ্ট রয়েছে, সেটুকু থাকতে-থাকতেই 'সম্মানজনক নিষ্কৃতি'ই শ্রেয়। অনেক হয়েছে, আর নয়। জন-পরিসর থেকে সরে গেলে তাঁকে নিয়ে কিছুটা হলেও চর্চা কমবে। তাছাড়া নতুন করে ফিরহাদের হারানোর কিছু নেই। এমতাবস্থায়, প্রি-ম্যাচিওরড রিটায়ারমেন্টই বুদ্ধিমানের কাজ। আর যাই হোক, ফিরহাদ হাকিমের বুদ্ধি নিয়ে তাঁর চরম শত্রুও একটুকু সংশয় প্রকাশ করেন না।
পুনশ্চ: এদিন ছোট-লালবাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে সাংবাদিকদের সামনে আবেগে আপ্লুত হয়ে ফিরহাদ বললেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ যে-চেয়ারে বসেছেন, সেই চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করতে না-পারলে চেয়ার ছেড়ে চলে যাওয়াই শ্রেয়। ভালো কথা। কিন্তু, বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ে পৌরসভার মেয়র পদ থেকে কেন ইস্তফা দিলেন তিনি, সরাসরি সে-প্রসঙ্গে গেলেন না তিনি। সে প্রশ্নের উত্তরও এড়িয়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করে শুধু বুঝিয়ে দিলেন, 'কারণ শুধায়ো না'।