মুন্নি চৌধুরী: রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু নেই, স্থায়ী শ্ত্রুও নেই— এই বহুল প্রচলিত কথাটা ভারতীয় রাজনীতিতে বহুবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই কথাকেও যেন নতুন...
মুন্নি চৌধুরী: রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু নেই, স্থায়ী শ্ত্রুও নেই— এই বহুল প্রচলিত কথাটা ভারতীয় রাজনীতিতে বহুবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই কথাকেও যেন নতুন মাত্রা দিচ্ছে। যে মুখগুলো কয়েক মাস আগেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে বাংলার একমাত্র রাজনৈতিক বিকল্প বলে তুলে ধরতেন, বিজেপি ও এনডিএ-কে আক্রমণ করতেন, তাঁরাই আজ বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়ে এনডিএ-কে সমর্থনের পথে হাঁটছেন। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের দাবি, বিদ্রোহী শিবিরে এখন ২২ জন সাংসদ। যদি সেই দাবি সত্যি হয়, তাহলে এটা শুধু একটি দলের ভাঙন নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় পুনর্বিন্যাস।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। সায়নী ঘোষ, দেব, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, এঁরা কেউই তৃণমূলের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক কর্মী নন। তাঁরা জনপ্রিয়তার জোরে রাজনীতিতে এসেছেন এবং তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াতেই। সেই মানুষগুলিই যখন আজ অন্য শিবিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে— আদর্শ কি সত্যিই এতটাই দুর্বল, নাকি রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি এখনও ক্ষমতাই?
একসময় সায়নী ঘোষ প্রকাশ্য সভা থেকে বলতেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই বাংলার শেষ ভরসা।" দেব বিজেপিকে কটাক্ষ করে একাধিক রাজনৈতিক মঞ্চে তৃণমূলের পক্ষে সওয়াল করেছেন। রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ও রাজনৈতিক বিতর্কে দলের অবস্থানকেই সমর্থন করেছেন। আজ তাঁরাই যদি বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র পাশে দাঁড়ান, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগবে— তাহলে এতদিনের বক্তব্য কি শুধুই রাজনৈতিক প্রয়োজন ছিল?
অবশ্য এর দায় শুধু দলত্যাগীদের উপর চাপিয়ে দিলেই সত্যিটা সম্পূর্ণ বলা হবে না। তৃণমূল কংগ্রেসও আত্মসমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের ভিতরে যে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং সংগঠনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, তার ফল আজ সামনে আসছে। অনেক নেতাই অভিযোগ করছেন, দল সংগঠনের বদলে কিছু ব্যক্তি ও পরামর্শদাতার উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। মাঠের কর্মীদের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব বেড়েছিল। সেই জমে থাকা ক্ষোভই আজ বিদ্রোহের রূপ নিচ্ছে। তবে রাজনীতির সবচেয়ে বড় সত্য হল, ক্ষমতা কখনও শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যে নেতারা আজ বিদ্রোহী শিবিরে, তাঁদের অনেকেই বুঝতে পেরেছেন যে রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র বদলে গিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে নতুন সমীকরণের দিকে ঝুঁকে পড়া বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত বলেই তাঁরা মনে করছেন। আদর্শের চেয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে।
কিন্তু এখানেই গণতন্ত্রের এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে। ভোটাররা কি ব্যক্তিকে ভোট দেন, নাকি দলের আদর্শকে? যদি একজন নেতা একটি দলের প্রতীক, মতাদর্শ এবং নেতার নামে ভোট চেয়ে জিতে পরে সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনৈতিক শিবিরে চলে যান, তাহলে সেই ভোটের নৈতিক মালিকানা কার? রাজনীতি অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তর খুব কমই দেয়। রাজনীতি ফলাফল দেখে, নীতি নয়; ক্ষমতা দেখে, আবেগ নয়। আজ যারা মমতার বিরুদ্ধে, কাল তারা আবার অন্য কোনও সমীকরণে তাঁর পাশেও দাঁড়াতে পারেন। কারণ রাজনীতির অভিধানে "অসম্ভব" শব্দটি সবচেয়ে দুর্বল শব্দগুলোর একটি।
২২ সাংসদের বিদ্রোহ, সেলিব্রিটি নেতাদের অবস্থান পরিবর্তন, ক্ষমতার কেন্দ্র বদল— সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবারও প্রমাণ করল, এখানে কোনও সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী যদি কিছু থাকে, তা হল ক্ষমতার আকর্ষণ এবং রাজনৈতিক সম্ভাবনার অনন্ত দরজা। আর সেই কারণেই বলা যায়— রাজনীতি সত্যিই বিরাট সম্ভাবনাময়। তবে সেই সম্ভাবনা সবসময় আদর্শের জন্য নয়, অনেক সময় ক্ষমতার জন্যও।