দেবতার কাজ সকলই যুক্তিযুক্ত। সকলই বিশ্বের মঙ্গলের জন্য। রাম অন্তরাল থেকে বালিকে হত্যা করলেন, যুক্তি রয়েছে বটে। ভীষ্মের সামনে দাঁড় করানো হল শিখণ্ডীকে। বীর অর্জুন নারী সত্তার অন্তরাল থেকে আঘাত হানলেন ত...
দেবতার কাজ সকলই যুক্তিযুক্ত। সকলই বিশ্বের মঙ্গলের জন্য। রাম অন্তরাল থেকে বালিকে হত্যা করলেন, যুক্তি রয়েছে বটে। ভীষ্মের সামনে দাঁড় করানো হল শিখণ্ডীকে। বীর অর্জুন নারী সত্তার অন্তরাল থেকে আঘাত হানলেন তীক্ষ্ণ বাণে। ধর্ম রক্ষার জন্য তা জরুরি ছিল। নিরস্ত্র কর্ণের বক্ষ ভেদ করল অঞ্জলীক। ধর্মের ধ্বজা উড়ল। অপরদিকে আট চিরঞ্জীবীর অন্যতম অশ্বত্থামা হলেন চির পাতকী। ব্রাহ্মণ সন্তান অস্ত্র ধরেছেন। মহারথী হয়েছেন নিজের ক্ষমতা বলে। ভরদ্বাজ মুণির পৌত্র, পিতা বীর শ্রেষ্ঠ দ্রোণাচার্য, মাতা কৃপী।

শৈশবকাল থেকেই পিতার কাছ থেকে ধনুর্বিদ্যার শিক্ষা নেন অশ্বত্থামা। উত্তর পাঞ্চালের রাজা ছিলেন অশ্বত্থামা। রাজধানীর নাম ছিল অহিছত্র। তাঁর রাজত্বে দুর্নীতির ছায়া পর্যন্ত ছিলনা। প্রজারা সকলেই সুখী ছিলেন। আদর্শ সন্তান ছিলেন, অশ্বের প্রতি প্রীতির জন্য দুর্যোধন তাঁকে একটি অশ্ব উপহার দিয়েছিলেন। সেদিন থেকে দুর্যোধনের প্রতি অটুট বন্ধুত্ব পালন করে এসেছেন অশ্বত্থামা। কৌরবদের সুরক্ষার জন্য গোটা জীবন অতিবাহিত করেছেন। কোথাও তাঁর সংসারের উল্লেখ পর্যন্ত নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে বারবার দুর্যোধনের কাছে অপমানিত হয়েছিলেন, কিন্তু কর্তব্য থেকে চ্যুত হননি। জীবনে একবারই চরম পাপ করেছিলেন রাতের অন্ধকারে উলূকের মত পাণ্ডব শিবিরে আক্রমণ করেন। এবং ব্রহ্মশিরঅস্ত্র চালনা করেন উত্তরার গর্ভে। পাপ তো বটেই কিন্তু এ ধরণের পাপ কি মহাভারতে আগে দেখা যায়নি?

পাশা খেলায় সর্বশান্ত হয়ে যাওয়ার পরও যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে বাজি রেখেছিলেন। ধর্মরাজ কী জানতেন না নারী পাশার বাজি হতে পারে না। দ্রৌপদীর চির হরণের স্তব্ধ ছিল মহাভারতের সকল নায়ক চরিত্র। তা কি পাপ ছিল না? লাক্ষাগৃহ যখন আগুনের গ্রাসে, দুর্যোধনের চোখে ফাঁকি দিতে এক নিষাদ মহিলা ও তাঁর পাঁচ পুত্রকে রেখে পালিয়েছিলেন পঞ্চপাণ্ডব। তাতো বাসুদেবের অজানা ছিল না। সেটা কি পাপ ছিল না? কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পঞ্চদশ দিন। দ্রোণের বাণের মুখোমুখি হতে পারছিলেন না পাণ্ডবদের কোনও যোদ্ধা। পাণ্ডব শিবিরে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছিল। নিজের লীলা বিস্তার করলেন লীলাময়। ভীমের গদার আঘাতে মারা গেল অশ্বত্থামা গজ। সকলে দ্রোণকে বললেন অশ্বত্থামা হত। বিশ্বাস করলেন না দ্রোণ। ভীমের সে ক্ষমতা কোথায় অশ্বত্থামাকে হত্যা করে! জিজ্ঞাসা করলেন যুধিষ্ঠিরকে। যুধিষ্ঠির বললেন অশ্বত্থামা হত।

এরপরেই সকলে শঙ্খ বাজালেন কৃষ্ণের পরিকল্পনায়। যুধিষ্ঠিরের উচ্চারিত ইতি গজ চাপা পড়ে গেল শঙ্খ নিনাদে। অস্ত্র পরিত্যাগ করলেন দ্রোণাচার্য। পাণ্ডব সেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণাচার্যকে খড়গাঘাতে হত্যা করলেন। এরপর মানুষের মন যদি প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে, তাহলে তার সব দায়ভার তাঁকে নিতে হবে কেন? দেবতার কোনও দায় নেই? আজও অভিশপ্ত জীবন বয়ে চলেছেন অশ্বত্থামা। আঘাতের রক্ত পুঁজ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন একাকী। মৃত্যু নেই, রয়েছে অসমাপ্ত এক জীবন। যে জীবনের সমাপ্তি আসবে কল্কি অবতারের আগমণে। তিনিই হবেন কল্কির পরম উপদেষ্টা। একটা উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই কি তাহলে যুগের পর যুগ পাপের হিসেব রাখতে তাঁকে বেছে নিয়েছেন বাসুদেব? উত্তর অজানা। দেবতার লীলা তিনিই জানেন।