কিছুদিন আগেও ছিট মহল ইস্যু নিয়ে এই জেলায় ভোট হত। কিন্তু এখন সময় কিছুটা হলেও বদলেছে। এখন এখানে ভোট হয় অন্য সমীকরণ মাথায় রেখে। আমরা আজকে আলোচনা করব কোচবিহার জেলা নিয়ে কিন্তু তার আগে জেনে নেওয়া যাক কোচ রাজাদের বিচরণ ক্ষেত্র এই জেলার সীমানা
জেলার সীমানা
রাজার শহর কোচবিহার। কোচরাজাদের বিহার ক্ষেত্র। রাজপ্রাসাদের শহর, মদনমোহনের শহর, হেরিটেজ শহর কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের একটি জেলা। ১৯৫০ সালের ১৯ জানুয়ারি, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক মানচিত্রে কোচবিহার একটি নতুন জেলা হিসাবে আবির্ভূত হয়। জেলাটির উত্তরে আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি। পূর্বে অবস্থিত অসমের কোকরাঝাড় ও ধুবরি জেলা। পশ্চিমে ও দক্ষিণে বাংলাদেশ। হিমালয়ের তরাই এবং ভারত-বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানা দিয়ে ঘেরা। কোচবিহার জেলায় মোট ন' টি বিধানসভা ক্ষেত্রে লড়াই সামনে। নটি বিধানসভা ক্ষেত্র হল, কোচবিহার দক্ষিণ, কোচবিহার উত্তর, দিনহাটা, মাথাভাঙ্গা, সিতাই, মেখলিগঞ্জ, শীতলকুচি এবং নাটাবাড়ি।
ভোট ইতিহাস, ভোটফলr
মেখলিগঞ্জ:
মেখলিগঞ্জ বিধানসভার প্রথম ভোট হয় ১৯৫১ সালে। ১৯৫১ এবং ৫৭ এখানে জয়লাভ করে জাতীয় কংগ্রেস তারপর দীর্ঘ সময় মেখলিগঞ্জ পরিচিত ছিল ফরোয়ার্ড ব্লকের দুর্গ হিসেবে। ২০১৬ সালেও এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূল প্রার্থী অর্ঘ্যরায় প্রধান। এরপর পরেশ অধিকারী তৃণমূলে যোগ দেন। বর্তমানে মেখলিগঞ্জের বিধায়ক তৃণমূলের পরেশ অধিকারী
মাথাভাঙা:
মাথাভাঙা বিধানসভায় প্রথম নির্বাচনের পর প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় কংগ্রেসের বোলবলা থাকলেও বাম আমলে এটি সিপিআইএম এর দুর্গ ছিল। বর্তমানে এই বিধানসভার বিধায়ক ভারতীয় জনতা পার্টির সুশীল বর্মণ।
কোচবিহার উত্তর:
কোচবিহার উত্তরে ২০২১ এর জিতেছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির সুকুমার রায়।
কোচবিহার দক্ষিণ:
কোচবিহার দক্ষিণে গত বিধানসভায় জয় পেয়েছিলেন বিজেপির নিখিলরঞ্জন দে।
শীতলকুচি:
শীতলকুচিতে জিতেছিলেন বরেনচন্দ্র বর্মন। ইনি বিজেপি বিধায়ক
সিতাই:
সিতাইয়ে জগদীশচন্দ্র বসুনিয়া জিতেছিলেন তৃণমূলের তরফে। তিনি পরবর্তী কালে বিধায়ক পদ ছেড়ে দিলে ২০২৪ সালে তৃণমূলের সঙ্গীতা রায় সিতাইয়ের বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন।
দিনহাটা:
দিনহাটা থেকে জিতেছিলেন তৃণমূলের উদয়ন গুহ। নাটাবাড়ি থেকে জিতেছিলেন বিজেপির মিহির গোস্বামী এবং তুফানগঞ্জ থেকে জিতেছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির মালতী রাভা রায়। যার অর্থ কোচবিহারে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের বিশ্লেষণে ন টি বিধানসভার ছটি আসন বিজেপির দখলে বাকি তিনটিতে উড়ছে ঘাসফুল পতাকা।
এবার দেখা যাক লোকসভার নিরিখে কোচবিহার পছন্দ করেছে কোন দলকে? ২০১৯ সালে এখান থেকে জিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন নিশীথ প্রামাণিক। ২০২৪ এ জিতেছিলেন জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া। ভোট বিন্যাস লক্ষ করলে দেখা যাবে এই লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে অবস্থিত বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে লড়াই মূলত দুই ফুলের মধ্যে। ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার তৃণমূলের দখলে থাকলেও শহর অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল। যার একটা সরল অর্থ হতেই পারে শহরাঞ্চলে নাগরিক পরিষেবায় খুশি নন ভোটাররা। ২০১৯ সালের বিজেপির বাঁধন বর্তমানে কিছুটা হলেও আলগা হয়েছে।
এবারের ভোট ইস্যু
২০২৬ সালে এই জেলার বিধানসভার লড়াইয়ে মূল ইস্যু অবশ্যই রাজনৈতিক হিংসা, কোচবিহারের অধুনা লুপ্ত ছিটমহল ও উন্মুক্ত সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে চোরাচালান ও অনুপ্রবেশের অভিযোগ রয়েছে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে , ২০২৬ এর ৩০ জানুয়ারি গিরিধারী সেতু ভেঙে পড়েছে। অভিযোগ, ধারণ ক্ষমতার বেশি ওজনের মালবাহী ডাম্পার পারাপারের ফলে এই দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনা কোচবিহারকে অস্থির করে তুলেছে। এছাড়াও অতিবৃষ্টিতে তিস্তা ও জলঢাকা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় মেখলিগঞ্জ ও হলদিবাড়ির মত এলাকা নিয়মিত ভাবে বন্যার কবলে পড়ছে। ভারী যানবাহনের চাপে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জেলার একাধিক সেতু ও রাস্তা ভেঙে পড়েছে, যা গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছে। এছাড়াও জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, বেকারত্ব, নিকাশি জেলার বড় সমস্যা। এসএসসি চাকরি ইস্যুতে পরেশ অধিকারীর কন্যা অঙ্কিতা অধিকারীর নাম জড়িয়ে যাওয়ায়, জেলায় প্রশ্নের মুখে পড়ে তৃণমূল। গ্রেটার কোচবিহার ইস্যু এখানে সবসময় আলোচনায় থাকে। জেলায় কামতাপুরী বা রাজবংশী ভোটব্যাংক প্রধান ভূমিকা পালন করে। গ্রেটার কোচবিহারের নেতা অনন্ত মহারাজ ওরফে নগেন্দ্র রায়কে রাজ্যসভার সাংসদ করেছে বিজেপি। নির্বাচনের আগে তৃণমূলের মাষ্টার স্ট্রোক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান বঙ্গবিভূষণে ভূষিত করা হল অনন্ত মহারাজকে। মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সম্মাননা নেওয়া এই রাজবংশী নেতাকে নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। এই সব মিলিয়ে কী হতে চলেছে কোচবিহারে ২০২৬ এর ভোট সমীকরণ? তা অবশ্য সময় বলবে।