দার্জিলিং জেলা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দুটি বিষয়ই মাথায় আসে। এক পাহাড়, দুই পাহাড়ি রাজনীতি। দার্জিলিং এর রাজনীতির অক্ষে বারবার উঠে এসেছে একাধিক নাম। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে দার্জিলিংএর রাজনৈতিক সমীকর...
দার্জিলিং জেলা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দুটি বিষয়ই মাথায় আসে। এক পাহাড়, দুই পাহাড়ি রাজনীতি। দার্জিলিং এর রাজনীতির অক্ষে বারবার উঠে এসেছে একাধিক নাম। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে দার্জিলিংএর রাজনৈতিক সমীকরণ যথেষ্ট জটিল। আমরা আলোচনা করব তার আগে চিনে নেব জেলাটিকে।
জেলার সীমানা
দার্জিলিং মানে বরফ, দার্জিলিং মানে পাহাড়ের গায়ে কুয়াশা, দার্জিলিং মানে টয়ট্রেন, দার্জিলিং মানে পাইন বন, দার্জিলিং মানে রাজনৈতিক অশান্তি, দার্জিলিং মানে সমতলের সঙ্গে রাজনৈতিক ভাগের চেষ্টা। দার্জিলিং এর ভৌগলিক সীমানা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। উত্তরে সিকিম, সিকিমের উত্তরে তিব্বত। যা চিনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। দক্ষিণে উত্তর দিনাজপুর ,পূর্বে কালিম্পং ও জলপাইগুড়ি জেলা, পশ্চিমে নেপালের কোশি প্রদেশ। দার্জিলিং আর নেপালকে পৃথক করেছে মেচি নদী। এবং দক্ষিণ-পূর্বে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা। দার্জিলিং নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সীমানা ভাগ করে। সুতরাং এই জেলার গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। দার্জিলিং জেলায় মোট বিধানসভা কেন্দ্রের সংখ্যা ৫টি। দার্জিলিং, কার্শিয়াং, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি, শিলিগুড়ি এবং ফাঁসিদেওয়া।
ভোট ইতিহাস, ভোটফল
দার্জিলিং
২০১৬ র বিধানসভা নির্বাচনে দার্জিলিং কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন অমর সিং রাই। জিতেছিলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার তরফে লড়াই করে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন বিজেপির নীরজ তামাং জিম্বা।
কার্শিয়াং
২০১৬ সালে কার্শিয়াং বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার তরফে রোহিত শর্মা। ২০২১ সালে এই আসনে ওড়ে বিজেপির পতাকা। জয়ী হয়েছিলেন বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা
মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি
এই বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১৬ সালে জিতেছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের শঙ্কর মালাকার। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে জয় পান বিজেপির অনিন্দ্যময় বর্মণ
শিলিগুড়ি
শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১৬ সালে জয় পেয়েছিলেন সিপিএম এর অশোক ভট্টাচার্য। যদিও ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে উড়েছিল বিজেপির পতাকা জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির শঙ্কর ঘোষ।
ফাঁসিদেওয়া
ফাঁসি দেওয়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জিতেছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের সুনীল তিরকি। ২০২১ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে এই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন বিজেপির দুর্গা মুর্মু।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির রাজু বিস্ত। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বদলায়নি সিনারিও। এই নির্বাচনেও জিতেছিলেন বিজেপির রাজু বিস্ত।
পাহাড়ের বরফে আগুন লেগেছে অনেকবার। ঝড়েছে রক্ত। বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে পাহাড়ে বারবার ছড়িয়েছে উত্তেজনা। বিভিন্ন সময় পাহাড়ি মানুষগুলি ভরসা রেখেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর। কখনও বা তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি থেকে গেছে কাগজে কলমে। এবারে বিধানসভা নির্বাচনে দার্জিলিং এর মূল ইস্যু কী ? দেখে নেওয়া যাক।
এবারের ভোট ইস্যু
দার্জিলিং এর ইস্যু বরাবর জটিল ও বহুমুখী। রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক সবদিক থেকে পাহাড় অস্থির। দার্জিলিং প্রধান ইস্যু স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান এবং অবশ্যই গোর্খাল্যান্ড দাবি। ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনের পর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা নতুন করে ইউনিয়ন টেরিটরির দাবি জোরালো করেছে। নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসে গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট সহ কিছু দল দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের জন্য ৬ষ্ঠ তফসিলের দাবি সামনে নিয়ে এসেছে। ১১টি গোর্খা সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতিভুক্ত করার দীর্ঘদিনের দাবিটি এখনো কেন্দ্র সরকারের বিবেচনাধীন অবস্থায় রয়েছে, যা নিয়ে পাহাড়ে অসন্তোষ আছে । এছাড়াও পাহাড়ে অধিকাংশ মানুষের জিটিএর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন এবং প্রশাসনের অবহেলায় দার্জিলিং এর চা শিল্পের অস্তিত্ব সংকটে। নেপাল থেকে নিম্ন মানের চা কম দামে আমদানি হয়ে দার্জিলিংয়ের জিআই ট্যাগযুক্ত চায়ের বাজার নষ্ট করছে । পশ্চিমবঙ্গ সরকার চা বাগানের ৩০% জমি পর্যটন বা অন্যান্য বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় চা শ্রমিক ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ২০২৫-এ দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে ভারী বৃষ্টিপাতে মারাত্মক ভূমিধস ও বন্যা হয়েছে, যার ফলে ৩৬ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকাও সন্তোষজনক নয়। দার্জিলিং মিউনিসিপ্যাল এলাকায় জনসংখ্যার চাপে জলের তীব্র সংকট রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং রাস্তায় গাড়ির চাপ বাড়ার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে ।