কাকুরা বাইরে চুপিসারে রেখে গিয়ে কয়েকটা বোম ফাটিয়ে দিল। দূর থেকে মোবাইলে বাজছে দরজা খুলে দেখ তোর হাবল এসেছে। দরজা খুলে দেখা গেল গোঁফওয়ালা একটা কার্তিক মূর্তি। ঘরে তুলে নেওয়ার কাতর আবেদন। সঙ্গে কাগজে লে...
কাকুরা বাইরে চুপিসারে রেখে গিয়ে কয়েকটা বোম ফাটিয়ে দিল। দূর থেকে মোবাইলে বাজছে দরজা খুলে দেখ তোর হাবল এসেছে। দরজা খুলে দেখা গেল গোঁফওয়ালা একটা কার্তিক মূর্তি। ঘরে তুলে নেওয়ার কাতর আবেদন। সঙ্গে কাগজে লেখা রয়েছে কাকাদের নাম এবং একটি পছন্দে মেনু। কয়েকটা জায়গা বাদ দিলে কার্তিক ঠাকুর তৈরির ওপর খুব একটা নজর দেওয়া হয় না। মোটামুটি ভাবে একটা পুরুষমূর্তি তৈরি করা হয়। প্রয়োজনে সেটাই বিশ্বকর্মা আবার কখনও সেটাই কার্তিক।

যাই হোক হালকা চালে কথা বাদ দিয়ে একটু কার্তিক পুজোর বিষয়টি সিরিয়াসলি দেখে নেওয়া যাক। আপামর বাঙালি বিশ্বাস করেন পুত্রলাভ হয় কার্তিকের কৃপায়। কার্তিক দেবসেনাপতি। শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। বাংলায় কয়েকটি জায়গা বাদ দিলে এই দেবতা একান্তই অবহেলিত। তবে তামিল তেলেগু বা মালয়ালম ভাষাভাষী মানুষ কার্তিককে বেশ গুরুত্ব দিয়েই পুজো করেন। কার্তিকের জন্ম বৃত্তান্ত রয়েছে স্কন্দপুরাণে। তারকাসুরকে বধ করতে প্রয়োজন এক শক্তিশালী দেবতা। আরজি গেল শিবের কাছে। একটা পুত্র চাই। শিবও ছুটলেন পার্বতীর কাছে। দুজনের মিলনের চরম মূহুর্তে দেবতারা সেখানে পৌঁছে গেলেন।

শিবের বীর্য গিয়ে পড়ল মর্তে। পৃথিবী সেই তেজ সইতে পারল না। সে তেজ সইতে পারল না স্বয়ং অগ্নি। তেজ ছড়িয়ে দেওয়া হল শরবনে। সেখানেই জন্ম হল কার্তিকের। সে সময় শরবনের পাশ দিয়ে ছয়জন কৃত্তিকা যাচ্ছিলেন। তারা একত্রে কার্তিককে স্তন্যদুগ্ধ পান করালেন। তখন থেকেই কার্তিক পরিচিত ষড়ানন নামে। কার্তিক ষড়রিপুকে দমন করে। কার্তিক কোথাও যৌনকর্মীদের দেবতাও। অবাক হলেও এটাই সত্যি। আজও বর্ধমানের কাটোয়ার যৌনপল্লিতে বেশ জাঁকজমক সহকারেই কার্তিকের আরাধনা করা হয়। সেখানে বেশ কিছু ঘরে দেবসেনাপতি কার্তিক উলঙ্গ।

বিবাহ-বঞ্চিতা, সমাজ ত্যাগী এই নারীরা কার্তিকের মধ্যেই তাঁদের কল্পিত জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পান। এখানে আর একটা তত্ত্ব উল্লেখ করা যেতে পারে। অতীতে জলপথই ছিল দূর যাতায়াতের একটি প্রধান মাধ্যম। ভীনদেশী সওদাগরদের মনোরঞ্জনের জন্য নদীর তীরে যৌনপল্লিও তৈরি হত। বাঁশবেড়িয়াতে কার্তিকপুজো বেশ জমকালো ভাবে হয়। বাঁশবেড়িয়া ছিল প্রাচীন সপ্তগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম এবং একসময় এটি একটি প্রধান বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। সেই বন্দরবাসিনী যৌনকর্মীরা কার্তিককেই তাঁদের উপাস্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এর দুটি কারণ।

কার্তিক ছাড়া অন্যান্য কুলীন গোত্রের দেবতা পুজোর অধিকার তাদের ছিল না। আর দ্বিতীয়ত। পেটের জ্বালায় দেহ বেচলেও এই জীবন তাদের কাছে অভিশাপের মত। কার্তিকের আশীর্বাদে পুত্র সন্তান লাভ হয়। অর্থাৎ যদি অঘটন বশত তাদের গর্ভে কোনও অবাঞ্ছিত সন্তান চলেও আসে, সে যেন কন্যা হয়ে পরবর্তীকালে অভিশাপের জীবন না কাটায়। দার্শনিক এবং সামাজিক ভাবে কার্তিকের বিভিন্ন রূপ হলেও, সন্তান উৎপাদনের দেবতা হিসেবেই আধুনিক কালে দেব সেনাপতি নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছেন। কার্তিকপুজোর মধ্য দিয়ে নিঃসন্তানদের বুকের ব্যথাই যেন প্রকট হয়ে ওঠে।