মণি ভট্টাচার্য: দেশ জুড়ে দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয়ে গিয়েছে SIR অর্থাৎ বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা। দ্বিতীয় ধাপে দেশের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে মোট ১২টি জায়গায় শুরু হয়েছে এই কর্মযজ্ঞ। ইতিমধ্যে এই তাল...
মণি ভট্টাচার্য: দেশ জুড়ে দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয়ে গিয়েছে SIR অর্থাৎ বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা। দ্বিতীয় ধাপে দেশের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে মোট ১২টি জায়গায় শুরু হয়েছে এই কর্মযজ্ঞ। ইতিমধ্যে এই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সে জন্যই বোধ হয় মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গ নিয়ে এত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তথাপি যেমন কথা তেমন কাজ, SIR শুরু হতেই আশানুরূপ ভাবে বঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ যে কিছুটা পাল্টেছে তা সাময়িক বোধগম্য। SIR শুরুর আগে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের তরফে বলা হয়েছিল যদি কারোর নাম বাদ যায়, সেক্ষত্রে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আন্দোলন হবে, ওদিকে বিজেপির সুর ছিল, এই বঙ্গ থেকে বাদ যেতে পারে প্রায় ১ কোটি অনুপ্রবেশকারী ভোটার। এসব কিছুর মধ্যেই SIR লাগু হতেই, সোমবার বিকেল থেকে একটা প্রশ্ন সার্বিক ভাবে বিরোধীদের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে শুরু করে দিয়েছে, সেটা হল, 'SIR কি NRC-এর প্রথম ধাপ?'

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, SIR হল Election Commission of India (ECI)-র উদ্যোগ, যেখানে বিশেষভাবে ভোটার তালিকা (electoral rolls) পুনরায় যাচাই ও সংশোধন করা হয়। কিন্তু NRC কোনও ভাবেই ECI এর উদ্যোগে নয়, বরং NRC কেন্দ্র সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উদ্যোগে হয়। সেক্ষত্রে SIR এর ইতিহাস যদি দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালে ECI গঠিত হলে মোট ৮ বার SIR হয়, সেক্ষত্রে পশ্চিমবঙ্গে শেষ SIR হয়েছিল ২০০২ সালে। কিন্তু কেন SIR কে NRC এর ব্যাক ডোর বলছেন রাজ্য রাজনীতির একাংশ?

SIR ঘোষণার পর তৃণমূলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ বিজেপিকে টার্গেট করে বলেছিলেন, বাবা মায়ের তথ্য চেয়ে যদি কোনও ভাবে নির্বাচন কমিশন কাউকে বিব্রত করে, তবে সেটা আমাদের রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। বা মঙ্গলে অভিষেক বন্দোপাধ্যায় সরাসরি বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে টার্গেট করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক ভাবে বাংলাকে টার্গেট করা হচ্ছে, ওই সাংবাদিক সম্মেলন থেকে অভিষেকের স্পষ্ট দাবি, যদি রাজনৈতিক ভাবে এই SIR না হত সেক্ষত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া অন্য রাজ্য গুলিতেও SIR নয় কেন? যেমন আসাম, মেঘালয়। কিন্তু এই ঘটনার মধ্যেই উল্লেখযোগ্য ভাবে বঙ্গ তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দোপাধ্যায় মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জ্ঞানেশ কুমারকেও টার্গেট করেন, তিনি আক্রমন করতে ছাড়েননি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহকেও। এবং সর্বসম্মত বার্তা হল এই যে, বৈধ ভোটার যেন বাদ না যায়। এক্ষত্রে বৈধ ভোটার হিসেবে কমিশন কাদের ধরবে? কমিশনের স্পষ্ট বার্তা ভোটার লিস্টে সেই থাকবে, যে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমান করতে সফল হবে।

যদিও এই নাগরিকত্ব যাচাই করার ক্ষমতা কমিশনের আছে কিনা তা নিয়ে বেশ খানিকটা তরজা সুপ্রিম কোর্টেও হয়, সেক্ষত্রে হলফনামা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে কমিশন জানায়, আমাদের ভোটার তালিকায় কারা থাকবে সেটা ঠিক করার ক্ষমতা সংবিধান কমিশনকে দিয়েছে। কিন্তু যারা তথাককিত কমিশনের নজরে অবৈধ ভোটার হিসাবে গণ্য হবে তাদের কি হবে সেটা নিয়ে কমিশন ভাবিত নয়। যদিও কমিশনের নজরে যোগ্য-অযোগ্যের মাপকাঠি ২০০২ সালের ভোটার লিস্ট, আপনার জন্ম শংসাপত্র এবং আপনার বা আমার বাবা-মায়ের নথি। বা সহজ বাংলায় বলতে গেলে আপনি বা আপনার পরিবার ভারতীয় নাগরিক কিনা সেটাই যাচাই। যদিও আপনি নাগরিক হিসাবে প্রমানে ব্যর্থ হলে আপনার জন্য CAA- এর পথ খোলা। কিন্তু নাগরিকত্ব প্রমানই প্রসঙ্গ তুলছে এই SIR ও NRC এর মধ্যে ফারাক কোথায়? ঘুরপথে তো কমিশনের মাধ্যমে কেন্দ্র তথ্য পেয়ে যাবে যে কারা নাগরিকত্ব প্রমানে ব্যর্থ? ওদিকে তাঁদের উপর নেমে আসবে না তো এই NRC নামক খাড়া? প্রশ্নটি কি ভীষণ অপ্রাসঙ্গিক? যেখানে কমিশনের বিরুদ্ধে এ রাজ্যের একাংশের অভিযোগ তারা নাকি বিজেপি ঘেঁষা, এমনকি মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জ্ঞানেশ কুমার গত ৬ মাস আগেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্র অর্থাৎ অমিত শাহের দফতরের সচিব ছিলেন।

স্বাভবিক ভাবে বিষয়টি যদি আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে দেখা যায়, তবে স্পষ্ট যে SIR এবং NRC দুটোই ভিন্ন আইন-ধারায় পরিচালিত। NRC হল নাগরিকদের নিবন্ধনের একটি প্রকল্প, যেখানে “নাগরিক” হিসাবে কারা অধিকারী তা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু SIR সম্পূর্ণ ভোটার তালিকার নিবন্ধীকরণ। যেখানে মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব যে, NRC বিল পাশ হবার পর গোটা দেশ যেভাবে প্রতিবাদ দেখিয়েছিল, সে সমস্ত প্রতিবাদকে একাই হার মানিয়েছিল বাংলা। কোনও ভাবে বাংলা এই NRC লাগু হওয়ার বিরোধী ছিল, যদিও রাজনৈতিক কিছু বিশেষজ্ঞদের মত এই NRC বিলই বিজেপিকে বাংলায় ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে ডুবিয়েছিল। এবার SIR, আনুষ্ঠানিক ভাবে তা NRCর অঙ্গ না হলেও আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে SIR এর ঘুঁটি এই বিধানসভায় কাকে এডভ্যান্টেজ দেবে সেটা বলবে আগামী ৩ মাস।