প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের অংশ ছিল মালদা। পানিনির বর্ণনায় এই অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। মালদার আদিনা মসজিদ দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম মসজিদগুলির মধ্যে অন্যতম। মালদা বাংলার রাজনীতিতে সবসময়েই বিশেষ জায়গা অবস্থান করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে মালদায় হাওয়া বইবে কোন দিকে আলোচনা করার চেষ্টা করব। তবে তার আগে জেনে নেব জেলার সীমানা
জেলার সীমানা
মালদায় রয়েছে মৌর্য যুগ থেকে গুপ্ত যুগের সাক্ষ্য। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন এই অঞ্চলের নাম রেখেছিলেন জান্নাতাবাদ। মালদার উত্তরে রয়েছে উত্তর দিনাজপুর জেলা দক্ষিণে মুর্শিদাবাদ, পূর্বে বাংলাদেশের রাজশাহী এবং পশ্চিমে বিহারের পূর্ণিয়া ও কাটিহার। জেলার পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা। এবং জেলার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে মহানন্দা নদী। ফুলহার নদী বিহারের কাটিহার হয়ে মালদা জেলায় প্রবেশ করে ভূতনি এলাকার কাছে গঙ্গায় মিশেছে। মালদা জেলায় মোট ১২ টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে । এগুলি হল হবিবপুর, গাজোল, চাঁচল, হরিশচন্দ্রপুর, মালতীপুর, রতুয়া, মানিকচক, মালদা, ইংরেজবাজার, মোথাবাড়ি, সুজাপুর এবং বৈষ্ণব নগর
হবিবপুর
২০১৬ সালে মালদার হবিবপুর বিধানসভা থেকে জয় পেয়েছিলেন বিজেপির খগেন মুর্মু। ২০২১ সালেও এই সিটটি ধরে রাখে বিজেপি। জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির জোয়েল মুর্মু।
গাজোল
২০১৬ সালে গাজোল বিধানসভাকেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের দীপালি বিশ্বাস ২০২১ সালে এই সিটটি চলে যায় বিজেপির দখলে। পদ্মশিবির থেকে জিতেছিলেন চিন্ময় দেব
চাঁচল
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চাঁচল থেকে জয়ী হন জাতীয় কংগ্রেসের আসিফ মেহবুব। যদিও ২০২১ সালে বিধানসভা ক্ষেত্রটিতে পালাবদল ঘটে। এখান থেকে জিতেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নিহাররঞ্জন ঘোষ।
হরিশচন্দ্রপুর
২০১৬ সালে এই আসন থেকে জিতেছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের মোস্তাক আলম। ২০২১ সালে জিতেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের তাজমুল হোসেন।
মালতীপুর
২০১৬ সালে মালতীপুর বিধানসভাক্ষেত্র থেকে জিতেছিলেন আলবেরুনি জুলকারনাইন। ২০২১ সালে এই কেন্দ্রটি চলে যায় তৃণমূলের দখলে। জয়ী হন তৃণমূলের আব্দুর রহিম বক্সি।
রতুয়া
রতুয়া থেকে ২০১৬ সালে জয়ী হয়েছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের সমর মুখোপাধ্যায়। এরপর তিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের হয়ে যেতেন রতুয়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে।
মানিকচক
২০১৬ সালে এই কেন্দ্র থেকে জেতেন জাতীয় কংগ্রেসের মোত্তাকিন আলম তবে ২০২১ সালে এই সিটটি কংগ্রেস ধরে রাখতে পারেন না। এই সিটটি জিতে নেয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাবিত্রী মিত্র।
মালদা
২০১৬ সালে মালদা কেন্দ্রে জয় পান জাতীয় কংগ্রেসের ভূপেন্দ্রনাথ হালদার। তবে ২০২১ সালে এই কেন্দ্রটি চলে যায় বিজেপির হাতে। জেতেন বিজেপির গোপালচন্দ্র সাহা।
ইংরেজ বাজার
২০১৬ সালে ইংরেজবাজার বিধানসভাকেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের নিহাররঞ্জন ঘোষ। তবে আসনটি ২০২১ সালে চলে যায় বিজেপির দখলে। জিতেছিলেন শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী।
মোথাবাড়ি
মোথাবাড়ি কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জয়লাভ করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাবিনা ইয়াসমিন। ২০২১ সালেও এই কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেন তৃণমূলের সাবিনা ইয়াসমিন।
সুজাপুর
সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জয়ী হয়েছিলেন কংগ্রেসের ইশা খান চৌধুরী। ২০২১ সালে এই আসন থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের মহম্মদ আবদুল গনি।
বৈষ্ণবনগর
২০১৬ সালে বৈষ্ণবনগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন কংগ্রেসের স্বাধীনকুমার সরকার । এরপরে স্বাধীন সরকার বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের চন্দনা সরকার। হারিয়েছিলেন বিজেপির স্বাধীনকুমার সরকার।
হাজার রাজনীতির ওঠাপড়া দেখেছে এই জেলা। বিগত দুই লোকসভা নির্বাচনে কোন দিকে ঝুঁকে এই জেলা দেখে নেওয়া যাক
লোকসভার হিসেব
মালদা বরাবর কংগ্রেসের দুর্গ। গণিখানের ছায়ায় বরাবর নির্বাচন হত এখানে। বর্তমানে গণি ছায়া কাটিয়ে মালদায় নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই মালদা জেলায় দুটি লোকসভা কেন্দ্র রয়েছে মালদা উত্তর এবং মালদা দক্ষিণ। মালদা উত্তরে ২০১৯ এবং ২০২৪ সালে জয় পেয়েছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির খগেন মুর্মু। মালদা দক্ষিণ লোকসভা অবশ্য কংগ্রেসের জয় ধরে রাখতে পেরেছে। ২০১৯ সালে এই আসন থেকে জয় পান কংগ্রেসের আবু হাসেম খান চৌধুরী এবং ২০২৪ সালে এই আসন থেকে জয়ী হন কংগ্রেসের ইশা খান চৌধুরী।
এবারে মালদায় ভোট লড়াই ত্রিমুখী। কোন কোন ইস্যুর ওপর এবারে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছ মালদায় চলুন দেখে নেওয়া যাক
এবারের ভোট ইস্যু
গঙ্গা ও ফুলহার নদীর ভাঙন মালদার সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিশেষ করে রতুয়ামানিকচক এবং কালিয়াচক-৩ ব্লকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়িজমি এবং ফসলি জমি হারাচ্ছেন। মালদহ জেলায় নদী-ভাঙন নিত্যদিনের সমস্যা। জেলার প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকা দিয়ে বয়ে গিয়েছে গঙ্গা। প্রতি বছরই ভাঙনে জেরবার হচ্ছে গঙ্গাপারের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভাঙন বিধ্বস্ত পরিবারগুলো বাস্তুহারা হয়ে ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। পানীয় জলে আর্সেনিক এই জেলার একটি বড় সমস্যা। ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষেরা ঘরবাড়ি হারানোর সাথে সাথে ভোটার কার্ডআধার কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হারিয়ে ফেলছেন যার ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যা ও ভাঙন ত্রাণের টাকা বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য দপ্তরে নিয়োগে অসঙ্গতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় স্কুল পরিকাঠামোরাস্তাঘাট এবং বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব এখনও বড় সমস্যা। বাংলাদেশ নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি এবং সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মালদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ রয়েছে।