ভৌগলিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ উত্তরদিনাজপুর। এই জেলার ভবিষ্যতের উপর অনেকটাই নির্ভর করে উত্তর পূর্ব ভারতের অস্তিত্ব। ইতিহাস, ভূগোল, শিল্প ও সংস্কৃতি সব মিলিয়ে এই জেলা আর পাঁচটি জেলার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা জানব এই জেলা সম্পর্কে। তবে তার আগে দেখে নেওয়া যাক জেলার সীমানা।
জেলার সীমানা
এই জেলার গা ঘেষে চিকেন নেক। রাজনৈতিক দিক থেকে এই জেলা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। এই জেলা একদিকে বাংলাদেশ এবং অপর দিকে বিহারের সঙ্গে সীমানা ভাগ করে। উত্তর দিনাজপুরের উত্তরে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি, দক্ষিণে দক্ষিণ দিনাজপুর। পূর্বে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমে বিহারের কিষাণগঞ্জ, পুর্নিয়া ও কাটিহার জেলা। এই জেলাটি বাংলাদেশের সঙ্গে ৪০৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা শেয়ার করে। এই জেলাতেই রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম কুলিক পাখি অরণ্য, এছাড়াও রয়েছে বাহিন জমিদার বাড়ি এবং সাপনিকলা ফরেস্ট। গোটা জেলাটিকে নয়টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভাগ করা যায়। সেগুলি হল চোপড়া, ইসলামপুর, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া, করণদিঘি, হেমতাবাদ, কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ এবং ইটাহার।
এই জেলার রাজনৈতিক সমীকরণ বেশ জটিল। বিধানসভায় ঘাসফুলের অবস্থান শক্তিশালী হলেও লোকসভায় কিন্তু ওড়ে বিজেপি পতাকা। বিধানসভা এবং লোকসভার ফল বিশ্লেষণ দেখে নেওয়া যাক এক নজরে
ভোট ইতিহাস, ফোট ফল
চোপড়া
২০১৬ সালের বিধানসভায় চোপড়া থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের হামিদুল রহমান। দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিপিএম। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এই আসন থেকে জয়ী হয়েছেন তৃণমূলের হামিদুল রহমান। তবে ভারতীয় জনতা পার্টি নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে উঠে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে
ইসলামপুর
ইসলামপুর বিধানসভা থেকে ২০১৬ সালে জয়ী হয়েছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের কানাইয়া লাল আগরওয়াল। তবে ২০২১ সালে এখানে ক্ষমতার পালা বদল হয়। এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূল কংগ্রেসের আবদুল করিম চৌধুরী।
গোয়ালপোখর
২০১৬ সালে গোয়ালপোখর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের মহম্মদ গুলাম রব্বানী দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন কংগ্রেসের আফজাল হোসেন। ২০২১ সালেও গুলাম রব্বানি তাঁর বিধায়ক পদটি এই কেন্দ্র থেকে ধরে রেখেছেন। শক্তি বাড়িয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বিজেপি।
চাকুলিয়া
২০১৬ সালে চাকুলিয়া বিধানসভায় উড়েছিল ফরয়োর্ড ব্লকের পতাকা। জয়ী হয়েছিলেন আলি ইমরান রামজ ২০২১ সালে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূলের আজাদ মিনাজুল আরফিন।
করণদিঘি
২০১৬ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন তৃণমূলের মনোদেব সিনহা। ২০২১ সালে বিধায়ক হন তৃণমূলেরই গৌতম পাল।
হেমতাবাদ
২০১৬ সালে হেমতাবাদ বিধানসভা থেকে জয়ী হয়েছিলেন সিপিএম এ দেবেন্দ্রনাথ রায়। ২০২১ সালে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে এই কেন্দ্রে। জয়ী হন তৃণমূলের সত্যজিৎ বর্মণ। দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে ভারতীয় জনতা পার্টি।
কালিয়াগঞ্জ
কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জয়ী হন জাতীয় কংগ্রেসের প্রমথনাথ রায়। ২০২১ সালে এই বিধানসভা কেন্দ্রটি চলে যায় বিজেপির দখলে। বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন বিজেপির সৌমেন রায়।
রায়গঞ্জ
২০১৬ সালে রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের মোহিত সেনগুপ্ত। ২০২১ সালে এই আসনটি দখল করে নেন বিজেপির কৃষ্ণ কল্যাণী। যদিও এরপর কৃষ্ণ কল্যাণী তৃণমূলে যোগদান করলে কেন্দ্রটিতে উপনির্বাচন হয়। উপনির্বাচনে তৃণমূলের হয়ে জয়লাভ করেন কৃষ্ণ কল্যাণী।
ইটাহার
ইটাহার কেন্দ্রে থেকে ২০১৬ সালে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের অমল আচার্য। ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের মোসারফ হোসেন এই আসনটিতে জয় পান।
উত্তর দিনাজপুরের বিধানসভা কেন্দ্র গুলির সিংহভাগ রায়গঞ্জ লোকসভার অন্তর্গত। ২০১৯ সালে এই রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির দেবশ্রী চৌধুরী। দেবশ্রী কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে রায়গঞ্জ থেকে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির কার্তিকচন্দ্র পাল। এছাড়াও উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া দার্জিলিং লোকসভা এবং ইটাহার বালুরঘাট লোকসভার অন্তর্গত এই দুই লোকসভায় ২০১৯ এবং ২০২৪ এ উড়েছিল বিজেপির পতাকা। উত্তর দিনাজপুরের রাজনৈতিক সমীকরণ অদ্ভূত। এই জেলার নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বিধানসভা নির্বাচনে ঘাসফুলের একছত্র অধিকার। কিন্তু লোকসভার নিরিখে এই জেলা বিজেপির শক্ত ঘাটি।
সামনেই বিধানসভা ভোট। একদিকে এসআইআর অন্যদিকে উন্নয়ন জেলায় ভোট ইস্যু একাধিক।এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কোন কোন ইস্যুর ওপর ভিত্তি করে ভোট হতে চলেছে এই জেলায়
এবারের ভোট ইস্যু
বর্তমানে উত্তর দিনাজপুরের সবথেকে বড় ইস্যু অবশ্যই এসআইআর। চাকুলিয়া বিধানসভা কেন্দ্রে এসআইআর এর প্রতিবাদে বিডিও অফিসে ভাঙচুর চালানো হয়। জখম হন একজন পুলিস আইসি। অবরোধ বিক্ষোভ দেখানো হয় রাজ্য সড়কে। এসআইআর নিয়ে গোয়ালপোখরেও বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে । সীমান্ত জেলা হওয়ায় অনুপ্রবেশকারী শনাক্তকরণ এবং রাজবংশী সম্প্রদায়ের ভোটারদের পরিচয় সংক্রান্ত সমস্যা একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে । রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক দখলের লড়াইয়ে তৃণমূল ও বিজেপি উভয়েই মরিয়া। অনন্ত মহারাজের মতো নেতাদের সঙ্গে শাসক দলের ঘনিষ্ঠতা বর্তমানে এই জেলায় নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এছাড়াও অনুন্নত পরিকাঠামো এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগ একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমির মালিকানা নিয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এখানকার ক্রনিক ডিজিজ। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া ব্লককে বিরোধী দলগুলি বারুদঘর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাজনৈতিক সহিংসতাও এখানকার রুটিন ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ট্যাব দুর্নীতি সংক্রান্ত পুলিসি তদন্ত স্থানীয় জনজীবনে প্রভাব ফেলেছে।