১৯৮৬ সালের ১ মার্চ চব্বিশ পরগনা জেলা বিভাজিত হয়ে গঠিত হয় দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাটি। জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় কিন্তু আয়তনের দিক থেকে এটি পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম জেলা। জেলার একদিকে সাগর অপরদিকে কলকাতা মহানগরীর একাংশ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার নির্বাচন সবসময় ঘটনা বহুল। এই পর্বে আমরা দক্ষিণ ২৪ পরগনা নিয়ে আলোচনা করব। তবে তার আগে জেনে নেব জেলার সীমানা
জেলার সীমানা
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সীমানা যদি আলোচনা করা যায় তাহলে এর উত্তরে কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনা পূর্বে বাংলাদেশ, পশ্চিমে হুগলি নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দক্ষিণে ভারতের বৃহত্তম বাদাবন। তারও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার। কৃষি এবং পর্যটন এখানকার অর্থনীতির মূল ভিত্তি। সুন্দরবন, বকখালি সমুদ্র সৈকত, সাগরদ্বীপ এবং ডায়মন্ড হারবার এখানকার প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিবছর মকরসংক্রান্তিতে পূণ্য স্নানের জন্য সাগরে জমায়েত হন লক্ষ লক্ষ পূণ্যার্থী। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় মোট ৩১ টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এই ৩১ টি কেন্দ্রের ২৯ টিতে উড়েছিল ঘাসফুলের পতাকা। ২০২১ সালে আর একটি আসন বেড়ে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ৩০ এ দাঁড়ায়।
ভোট ইতিহাস, ভোট ফল
এই জেলায় হাওয়া ঘোরাতে তৎপর বিজেপি। ২০২৬ এর ভোট ঘোষণার পরেই তৃণমূল ছাড়লেন এককালের তৃণমূলের বাহুবলী নেতা আরাবুল ইসলাম। শক্তি কিছুটা খর্ব হল কিনা তা অবশ্য সময় বলবে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রতিটি কেন্দ্রই ঘটনাবহুল। তার মধ্য থেকে কয়েকটি আসন গত দুটি বিধানসভায় কী ফল করেছে দেখে নেওয়া যাক।
কুলতলি
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কুলতলি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন সিপিএম এর রামশঙ্কর হালদার। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন তৃণমূল কংগ্রেসের গণেশ মণ্ডল
ক্যানিং পূর্ব
ক্যানিং পূর্ব থেকে ২০১৬ এবং ২০২১ সালে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের সওকত মোল্লা
মগরাহাট পশ্চিম
এই কেন্দ্র থেকে ২০১৬ এবং ২০২১ সালে জয়ী হয়েছিলে তৃণমূলের গিয়াসউদ্দিন মোল্লা
ডায়মন্ড হারবার
ডায়মন্ডহারবার থেকে ২০১৬ সালে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের দীপক হালদার। পরে দীপক হালদার বিজেপিতে যোগ দিলে, ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের পান্নালাল হালদার।
বাসন্তী
২০১৬ সালে বাসন্তী বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের গোবিন্দচন্দ্র নস্কর। হারিয়েছিলেন সিপিআইএম এর শ্যামল মণ্ডলকে। এরপরে দলবদলে শ্যামল মণ্ডল তৃণমূলে যোগ দেন। এবং ২০২১ সালে তৃণমূলের হয়ে জয় পান শ্যামল মণ্ডল।
বেহালা পূর্ব
২০১৬ সালে বেহালা পূর্ব আসন থেকে বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী শোভন চট্টোপাধ্যায়। ২০১৯ এ তিনি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি ত্যাগ করলেও তৃণমূল থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। ২০২১ এই কেন্দ্র থেকে জয় পান তৃণমূল প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায়
বেহালা পশ্চিম
বেহালা পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৬ ও ২০২১ সালে জয় পান তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
ভাঙড়
২০১৬ সালে ভাঙড় থেকে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের রেজ্জাক মোল্লা। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয় পান বাম সঙ্গী আইএসএফ প্রার্থী নওসাদ সিদ্দিকী।
যাদবপুর
যাদবপুর কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সালে জয়ী হয়েছিলেন সিপিএম এর সুজন চক্রবর্তী। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয় পান তৃণমূলের দেবব্রত মজুমদার
টালিগঞ্জ
এই কেন্দ্র থেকে ২০১৬ এবং ২০২১ সালে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা অরূপ বিশ্বাস।
কাকদ্বীপ
কাকদ্বীপ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৬ ও ২০২১ সালে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের মন্টুরাম পাখিরা
সাগর
সাগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৬ এবং ২০২১ সালে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা।
রায়দিঘি
২০১৬ সালে রায়দিঘি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছিলেন তৃণমূলের দেবশ্রী রায়। ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয় পান তৃণমূল কংগ্রেসের অলোক জলদাতা
লোকসভার হিসেব
বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিন ২৪ পরগনা ঘাসফুলময়। এই জেলায় মোট পাঁচটি লোকসভা কেন্দ্র। জয়নগর, মথুরাপুর, যাদবপুর, ডায়মন্ড হারবার, কলকাতা দক্ষিণ। লোকসভায় এই জেলার ফল কী রকম চলুন দেখে নেওয়া যাক
জয়নগর
জয়নগর লোকসভা কেন্দ্র থেকে ২০১৯ ও ২০২৪ সালে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিমা মণ্ডল
মথুরাপুর
এই কেন্দ্র থেকে ২০১৯ সালে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের চৌধুরী মোহন জাটুয়া। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের বাপি হালদার।
যাদবপুর
২০১৯ সালে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের মিমি চক্রবর্তী। ২০২৪ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছিলেন সায়নী ঘোষ
ডায়মন্ডহারবার
ডায়মন্ড হারবার থেকে ২০১৯ এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রেকর্ড ভোটে জিতেছিলেন তৃণমূলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা দক্ষিণ
এই কেন্দ্র থেকে ২০১৯ এবং ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের মালা রায়
এবারের ভোট ইস্যু
এককথায় দক্ষিণ ২৪ পরগনা ঘাসফুলের দূর্গ। বিরোধীদের হাজার চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও এই জেলার মানুষ রয়েছেন তৃণমূলের সঙ্গে। ২০২৬ এর নির্বাচনে কী হতে চলেছে শাসক দলের অস্ত্র? বিরোধীরাই বা কোন কোন ইস্যু তুলে ধরছেন শাসক দলের বিরুদ্ধে?
নির্বাচন কমিশন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভোট প্রস্তুতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিশেষ সংশোধনী প্রক্রিয়ার শুনানিতে বিভিন্ন অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। প্রায় ৫ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিভ্রান্তিকর বা অসঙ্গতিপূর্ণ ফর্ম জমা পড়েছে। আসন্ন নির্বাচনের জন্য প্রার্থী বাছাই ও জেলা সংগঠনে রদবদল নিয়ে বিতর্ক চলছে। তৃণমূল কংগ্রেস দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন এনেছে, যেখানে প্রাক্তন মন্ত্রীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও এই জেলা সুন্দরবন সংলগ্ন হওয়ায় বারংবার উপকূল অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং নদী ভাঙনের কবলে পড়ে, যা জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত করে।উপকূলীয় এলাকায় ভূগর্ভস্থ জল নোনা হওয়ায় মিষ্টি জলের তীব্র সংকট রয়েছে। নদীর বাঁধ নিয়মিত ভেঙে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ও চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকে পড়ার সমস্যা রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বিশেষ করে দ্বীপ অঞ্চলে যাতায়াত ও যোগাযোগের অভাব।কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং অধিকাংশ পরিবার কৃষি-নির্ভর হওয়ায় দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট। অধিকাংস এলাকা দুর্গম হওয়ায় প্রশাসনিক পরিষেবা পৌঁছাতে দেরি হয়।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূলের সংগঠন শক্তিশালী তা অস্বীকার করার জায়গা নেই। কিন্তু জীবনযাত্রায় উন্নয়নের মাপকাঠিতে জেলার মানুষদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ২০২৬ এর নির্বাচনে মানুষ কি বদলাবে তাদের মত? সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।