অনিন্দ্য বিশ্বাস: বামপন্থী ভাবাদর্শ একসময় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নিপীড়িত, শ্রমিক, কৃষক ও সর্বহারার সাম্য ও মুক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। মার্ক্স, এঙ্গেলসের রাজনৈতিক মতাদর্শ পথ দেখাতে শুরু করেছিল সর্বহারা শ্রেণীকে। তবে সময় বড় দায়, আর কালের নিয়মে এই শতকে দাঁড়িয়ে বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রে ও ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এই শক্তি এখন প্রায় স্তিমিত। আসুন একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক দেশ ও বিশ্বের রাজনীতিতে বামেদের উত্থান ও পতনের গল্প, যা সমসাময়িক রাজনীতিকে বেশ ভালো ভাবেই নাড়া দিয়ে গেছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকটায় বামপন্থার উত্থান ছিল আলোর গতিতে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব গোটা বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের এক নতুন সংজ্ঞা নিয়ে আসে। লেলিনের নেতৃত্বে সোভিয়েতের গঠন, তৎকালীন পুঁজিবাদের ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়ায় তৈরি হয় কমিউনিস্ট শাসন। তবে ১৯৮৯ সালে বার্লিনের ও ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বাম সাম্রাজ্যকে ধাক্কা দেয় অনেকটাই। পরবর্তী সময়ে চীন নিজেকে 'সমাজতান্ত্রিক দেশ' হিসেবে দাবি করলেও, বাস্তবে তারা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের পথই বেছে নিয়েছে। কিউবা বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোও আজ বিশ্বায়নের বাজারে টিকে থাকতে নিজেদের অর্থনৈতিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। লাতিন আমেরিকায় একসময় যে Pink Tide এসেছিল, যেখানে ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া বা ব্রাজিলে বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছিল, সেখানে পূর্ণ শক্তিতে টিকে থাকলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। ইউরোপের মাটিতেও ঐতিহ্যবাহী কমিউনিস্ট দলগুলো আজ প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, সেখানে জায়গা করে নিয়েছে উগ্র ডানপন্থী শক্তিগুলো।
ভারতবর্ষেও বামপন্থী আন্দোলনের কিন্তু এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। একটা সময়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনে বামপন্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) এবং পরবর্তীকালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা CPM দেশের রাজনীতিতে এক শক্তিশালী বিকল্প মেরু গড়ে তুলেছিল। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং কেরালা ছিল ভারতের বামপন্থার তিনটি প্রধান দুর্গ। কিন্তু বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে বাম দুর্গের পতনই চোখে পড়ে। একটানা ৩৪ বছর (১৯৭৭-২০১১) পশ্চিমবঙ্গে শাসন করার পর, আজ রাজ্যের বিধানসভায় বামপন্থীদের আসন সংখ্যা এক । যে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের শিল্পায়নের জেদ বামফ্রন্টের পতনের অনুঘটক হয়েছিল, তা থেকে দল আজও শিক্ষা নিতে পারেনি। ২০১৮ সালে ২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ত্রিপুরায় গেরুয়া শিবির ক্ষমতা দখল করে। বর্তমানে সেখানেও বামপন্থীরা প্রধান বিরোধী দলের তকমা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। শুধুমাত্র কেরালা বর্তমানে ভারতের একমাত্র রাজ্য, যেখানে বামপন্থীরা ক্ষমতায় টিকে রয়েছে। কিন্তু সেখানেও জাতীয় স্তরের রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলা এবং অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মোকাবিলা করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বামপন্থীরা ৬০টিরও বেশি আসন পেয়ে দেশের সরকার গঠনে কিং-মেকারের ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে তাদের আসন সংখ্যা একক অঙ্কে নেমে এসেছে।
বামপন্থার সবচেয়ে বড় সংকট হলো সময়ের সাথে সাথে নিজেদের পরিবর্তন না করা। একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তি চালিত সমাজকে এখনও বিংশ শতাব্দীর 'সর্বহারা বনাম বুর্জোয়া' তত্ত্বে বিচার করার চেষ্টা বামপন্থীদের সাধারণ মানুষের থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে প্রথাগত কল-কারখানার শ্রমিক শ্রেণীর চরিত্র বদলেছে। আজ 'গিগ ইকোনমি' (Gig Economy), আইটি সেক্টর এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি। বামপন্থীরা এই নতুন ধরণের কর্মজীবী মানুষের অধিকার ও মানসিকতা বুঝতে প্রায় ব্যর্থ। তরুণ প্রজন্মের একাংশ অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্খী, তারা দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি, স্টার্ট-আপ কালচার এবং ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগী। বামপন্থীদের প্রথাগত পুঁজিবাদের বিরোধিতা এবং কর্পোরেট-বিদ্বেষী মনোভাব নতুন প্রজন্মের একাংশের কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়নি। পুঁজিবাদ বা বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা বামপন্থীরা খুব ভালোভাবে করলেও, তার বিপরীতে তারা কী সুনির্দিষ্ট বিকল্প মডেল দিতে চায়, তা স্পষ্ট করতে পারেনি। ফলে সাধারণ মানুষ সমালোচনার চেয়ে বাস্তব সমাধানের দিকে ঝুঁকেছে।
শেষ এক দশকে ভারতে আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। বামপন্থীরা যেখানে শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলে, সেখানে ডানপন্থীরা জাতীয় গৌরব ও ধর্মীয় আবেগের তাস খেলে সাধারণ মানুষের মন জয় করে নিয়েছে সহজেই । ভারতে বামপন্থীদের তথাকথিত 'ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি' বহুলাংশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। বামপন্থার সাংগঠনিক পতন হলেও, যে বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে এই মতাদর্শের জন্ম হয়েছিল, সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব, পুঁজিপতিদের শোষণ এবং দারিদ্র্য, সেগুলো কিন্তু পৃথিবী থেকে মুছে যায়নি। বরং কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আরও প্রকট হয়েছে। ফলে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের জন্য বামপন্থী মতাদর্শের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি।
বামপন্থী রাজনীতির পতন আসলে এক সংকীর্ণ ও অনমনীয় রাজনৈতিক দর্শনের পতন। রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বা পুরনো তত্ত্ব আঁকড়ে ধরে আজকের দিনে আর মানুষের মন জয় করা সম্ভব নয়। ভারতের মত বৈচিত্র্যময় দেশে যদি বামপন্থীদের আবার ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তবে তাদের ভারতীয় সংস্কৃতির শিকড়কে আপন করতে হবে, তত্ত্বের কচকচানি ছেড়ে মানুষের রোজকার রুটি-রুজির বাস্তব লড়াইয়ে নামতে হবে এবং তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনতে হবে। লাল পতাকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারা নিজেদের কতটা বদলাতে পারছে, তার ওপর।