মণি ভট্টাচার্য: ২০ জুন, এই মুহূর্তে যে তারিখকে আমরা পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে জেনেছি। এটা শুধু তারিখ নয়, একটি মতাদর্শের লড়াই। প্রশ্ন উঠছে, কেন বামপন্থী দলগুলি, কংগ্রেস এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে মেনে নিতে চায়নি? কেন ২০ই জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবসের কথা উঠতেই, তড়িঘড়ি পয়লা বৈশাখকে রাজ্য দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়েছিল? এই বিরোধিতার পিছনে কি শুধুই প্রশাসনিক কারণ, নাকি রয়েছে ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যা নিয়ে আলোচনা হলে বহু প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বয়ান প্রশ্নের মুখে পড়ে?
প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালের ২রা জুন বঙ্গীয় আইনসভায় দুটি পৃথক অধিবেশন বসে। হিন্দু-অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিনিধিরা ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন যে, বাংলা ভাগ হবে এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই ভোটাভুটিতে ৫৮ জন সদস্য বাংলা ভাগের পক্ষে এবং পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে মত দেন। অন্যদিকে মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলের সদস্যরা পাকিস্তানের পক্ষে মত দেন। এই সিদ্ধান্তের পিছনে অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু স্বাধীনতার পরে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা নিয়ে সবসময় এক ধরনের অস্বস্তি দেখা গিয়েছে। কারণ, যদি স্বীকার করতেই হয় যে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পিছনে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক, তাহলে বামপন্থী ও কংগ্রেসি ইতিহাসচর্চার বহু পুরনো ব্যাখ্যা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি তুলবে।
প্রথম কারণ: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে স্বীকৃতি দিতে অনীহা
বাম ও কংগ্রেসের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে শ্যামাপ্রসাদকে মূলত হিন্দু মহাসভার নেতা হিসেবেই চিহ্নিত করেছে। তাঁর পশ্চিমবঙ্গ গঠনে অবদানকে সামনে আনলে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনও নতুন করে আলোচনায় আসে। আর সেখানেই তৈরি হয় অস্বস্তি। কারণ, যদি বলা হয় পশ্চিমবঙ্গ একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার আশঙ্কা থেকে বাঙালি হিন্দুরা পৃথক প্রদেশ চেয়েছিলেন, তাহলে দেশভাগের প্রচলিত একমাত্রিক ব্যাখ্যা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
দ্বিতীয় কারণ: নোয়াখালি, কলকাতা দাঙ্গা এবং উদ্বাস্তু ইতিহাসের পুনরালোচনা
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা এবং নোয়াখালির ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসা বাংলা ভাগের দাবিকে শক্তিশালী করেছিল—এই বক্তব্য বহু ঐতিহাসিকই উল্লেখ করেছেন। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরে এই উদ্বাস্তু অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিকভাবে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বামপন্থী রাজনীতি শ্রেণি সংগ্রামের প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, উদ্বাস্তু হিন্দু সমাজের নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্নকে নয়।
তৃতীয় কারণ: পয়লা বৈশাখ বনাম ২০ জুন—সাংস্কৃতিক না রাজনৈতিক?
যখন ২০ জুনকে সামনে আনা হয়, তখন পাল্টা পয়লা বৈশাখকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সমালোচকদের প্রশ্ন, কেন এমন একটি দিন বেছে নেওয়া হল, যার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জন্মের সরাসরি সম্পর্ক নেই? তাঁদের মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল ২০ জুনের রাজনৈতিক তাৎপর্যকে আড়াল করা এবং বাংলা ভাগের ইতিহাসকে জনমানসে গুরুত্বহীন করে তোলা।
চতুর্থ কারণ: ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি
সমালোচকদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি হয়েছে। সেই কারণে বাংলা ভাগের ইতিহাস, নোয়াখালির ঘটনা কিংবা পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পেছনের সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, ২০ জুনকে গুরুত্ব দেওয়া মানেই সেই সময়কার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, উদ্বাস্তু স্রোত এবং হিন্দু সমাজের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাকে সামনে আনা। আর সেই কারণেই এই দিনটিকে দীর্ঘদিন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
কিন্তু আরেকটি প্রশ্নও রয়েছে
তবে ইতিহাসের অন্য একটি ব্যাখ্যাও আছে। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, বাংলা ভাগ ছিল এক বেদনাদায়ক প্রয়োজনীয়তা, কিন্তু তা উদযাপনের বিষয় নয়। তাঁদের মতে, ২০ জুনের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেটিকে এমনভাবে তুলে ধরা উচিত যাতে বিভাজনের ক্ষত নয়, ইতিহাসের শিক্ষা সামনে আসে।
কেন ২০ জুন গুরুত্বপূর্ণ?
২০ জুন শুধুমাত্র একটি তারিখ নয়। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে পশ্চিমবঙ্গের জন্ম হয়েছিল এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে। উদ্বাস্তু মানুষের কান্না, সাম্প্রদায়িক হিংসার ক্ষত, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তাই ২০ জুনকে ঘিরে বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু বিতর্কের ভয় পেয়ে ইতিহাসকে আড়াল করা যায় না। বরং ইতিহাসের সমস্ত দিক—সমর্থন, বিরোধিতা, সাফল্য ও ব্যর্থতা—সবকিছুকেই সামনে এনে নতুন প্রজন্মকে জানানো উচিত, পশ্চিমবঙ্গ কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং কেন এই রাজ্যের অস্তিত্বের প্রশ্ন একসময় এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।