মণি ভট্টাচার্য: বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা, তোলাবাজি, রাজনৈতিক হিংসা এবং প্রশাসনিক শিথিলতা নিয়ে বিতর্ক ছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর একের পর এক প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে বার্তা দিতে চাইছেন, তা হল আইন ভাঙলে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের মুখোমুখিই হতে হবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করেছে।
সেবাশ্রয় বিতর্কে সরকারের কড়া অবস্থান:
রাজ্যজুড়ে পরিচালিত "সেবাশ্রয়" ক্যাম্পকে ঘিরে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, কোথাও ভুয়ো চিকিৎসা শিবির, কোথাও জোর করে নার্সিংহোমের কাছ থেকে অর্থ আদায়, আবার কোথাও রিসর্ট বা বেসরকারি সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে। সরকারও বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়নি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্য মঞ্চ থেকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি এমনও মন্তব্য করেছেন যে মানুষের জীবন নিয়ে খেললে তা শুধু দুর্নীতি নয়, "খুনের চেষ্টার সামিল"এবং সেই অপরাধে কেউ রেহাই পাবে না। এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের উপর হামলার পর নজিরবিহীন পদক্ষেপ:
অন্যদিকে, এসএফআই ও তথাকথিত "ককরোচ" আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের উপর হামলা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং পুলিশের উপর আক্রমণের ঘটনায় সরকার নজিরবিহীন কড়া অবস্থান নিয়েছে। রাজ্যে প্রথমবারের মতো গুন্ডা দমন আইন প্রয়োগ করা হয়েছে।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। প্রায় ৭০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। একাধিক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিশেষ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে কয়েকজন অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করে জানিয়েছেন, "আইনের হাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না। এমন ব্যবস্থা করা হবে, যাতে আগামী প্রজন্মও মনে রাখে।" সরকারের এই অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, রাজনৈতিক আন্দোলনের আড়ালে হিংসা বা দুষ্কৃতীমূলক কার্যকলাপকে আর প্রশাসন প্রশ্রয় দেবে না।
বারুইপুর কাণ্ড ও এনকাউন্টার:
সম্প্রতি নরী নির্যাতনের এক বহুল আলোচিত মামলায় বারুইপুরে মূল অভিযুক্ত পুলিশের এনকাউন্টারে নিহত হয়। এই ঘটনা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও সরকারের অবস্থান ছিল স্পষ্ট,মহিলাদের বিরুদ্ধে নৃশংস অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।আইন নিজের গতিতে চলবে, এই বার্তাকেই সরকার সামনে রাখতে চেয়েছে।
প্রশাসনের নতুন দর্শন?
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারী একাধিকবার বলেছেন, বাংলায় "গুন্ডারাজ" চলবে না। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, পুলিশের উপর হামলা, সাংবাদিক নিগ্রহ কিংবা সংগঠিত তোলাবাজি, সব ক্ষেত্রেই কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তিনি বারবার জানিয়েছেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, সরকার চেষ্টা করছে এমন একটি প্রশাসনিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে, যেখানে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে আপসের কোনও জায়গা থাকবে না। অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপগুলির মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। সরকারের বক্তব্য, আইন নিজের কাজ করছে এবং অপরাধীকে তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে বিচার করা হচ্ছে না।
সেবাশ্রয় বিতর্ক, সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনায় গুন্ডা দমন আইন প্রয়োগ, নারী নির্যাতনের মামলায় দ্রুত পুলিশি পদক্ষেপ—এই ঘটনাগুলিকে সামনে রেখে রাজ্য সরকার যে বার্তা দিতে চাইছে, তা স্পষ্ট, বাংলায় আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানই হবে প্রশাসনের নতুন পরিচয়। এই কৌশল রাজনৈতিকভাবে কতটা সফল হবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে প্রশাসনিক স্তরে শুভেন্দু অধিকারী নিজেকে "কঠোর আইনপ্রয়োগকারী মুখ্যমন্ত্রী" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন—সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।