সবুজ মুখোপাধ্যায়: তখনও উনিশের লোকসভা ভোট হয়নি। তখনও আঁচ করা যায়নি, বিজেপিকে ১৮ জন সাংসদ উপহার দেবে বাংলা। এমনই এক সময়ে, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়ে আসেন জগদীপ ধনখড়। যিনি পেশায় দুঁদে আইনজীবী। জনতা দলের টিকিটে রাজস্থান থেকে সাংসদ হয়ে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের জমানায় রাষ্ট্রমন্ত্রী। আর হ্যাঁ, বাংলার প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের 'পরিচিত'।
২০১৯ সালের ৩০ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়ে আসেন ধনখড়। তিনবছর পর, ২০২২-এর ৩০ জুলাইয়ের আগেই, উপরাষ্ট্রপতি পদে এনডিএ-র প্রার্থী হন তিনি। তারও তিন বছর পর, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে রহস্যজনকভাবে উপরাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দেন জগদীপ ধনখড়।
এখানেই শেষ নয় ধনখড়ের জুলাই-রহস্য। তিনবছর আগে, এই জুলাই মাসেই, যাবতীয় রাজনৈতিক সমীকরণ ওলট-পালট করে দিয়ে, দার্জিলিঙে চায়ের কাপে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সৌজন্য-বৈঠক করেন তিনি। ১৩ জুলাই, দার্জিলিঙের রাজভবনে, মিনিট চল্লিশের সেই অরাজনৈতিক আলাপচারিতায় উপস্থিত থাকেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। আর সেই বৈঠকের পর, খবর আসে, এনডিএ-র পক্ষ থেকে উপরাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেয়েছেন জগদীপ ধনখড়।
এদিকে, একুশের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় গেরুয়া রথ রুখে দিয়ে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তখন বিজেপি-বিরোধী মুখ হিসেবে পরিচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্ডিয়া জোট তৈরি হয়নি ঠিকই, তবে কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা ধীরে-ধীরে জোট বাঁধতে শুরু করে দিয়েছে। উপরাষ্ট্রপতি পদে বিরোধী জোটের প্রার্থী কংগ্রেসের মার্গারেট আলভা। নির্বাচনের দিন, ভোটদানে বিরত থাকে তৃণমূল কংগ্রেস। জয়ী হয় এনডিএ-র প্রার্থী জগদীপ ধনখড়।
বাংলায় রাজ্যপাল হিসেবে থাকার সময়ে ধনখড়ের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 'মধুর সম্পর্কে'র কথা কাউর অজানা নয়। প্রায় প্রতিদিনই টুইট করে (তখনও এক্স হ্যান্ডেল হয়নি) রাজ্য সরকারের মুণ্ডুপাত করছেন ধনখড়। পাল্টা ধনখড়কে একহাত নিচ্ছেন তৃণমূল নেতারা। কখনও রাজভবনে উপাচার্যদের ডেকে পাঠাচ্ছেন ধনখড়। আর, তাঁরা অনুপস্থিত থাকায় ভিডিয়ো শেয়ার করে রাজ্যকে বিঁধছে রাজভবন। রাজ্য-রাজ্যপাল সম্পর্ক এতোই তিক্তহয়ে ওঠে যে, সংসদের অধিবেশনে, ধনখড়কে সরানোর জন্য নরেন্দ্র মোদীর কাছে দরবার করেন তৃণমূলের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
এমনই এক পরিস্থিতিতে, দার্জিলিঙের রাজভবনে, হিমন্ত বিশ্বশর্মার মধ্যস্থতায় ধনখড়-মমতার সৌজন্য বৈঠকে গল্প পুরো ঘুরে যায়। দিল্লিতে বিজেপি-বিরোধী অঘোষিত জোটের প্রার্থী মার্গারেট আলভাকে সমর্থন জানানোর বদলে ভোটদানে বিরত থাকে তৃণমূল। উপরাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হন ধনখড়। আর তারপই, মমতা বন্দ্যেপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান ধনখড়। মমতার উদ্দেশে কার্যত হাতজোড় করে ধনখড়কে বলতে শোনা যায়, 'আমি তাঁকে ( মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে) বলেছি, আমি আর আপনার রাজ্যের রাজ্যপাল নই। বুকে হাত রেখে বলুন, রাজ্যপাল হিসেবে আমি যা করেছি এতদিন, তা কি আদৌ সংবিধান-বিরোধী ছিল। আমার সম্পর্কে তিনি যে মন্তব্যই করুন-না কেন, আমি কি তার পাল্টা এমন কোনও মন্তব্য করেছি, যাতে করে তাঁর সম্ভ্রমহানি হয়। আমি যা করেছি তা লিখিত-পড়িতভাবে করেছি, সংবিধান মেনে করেছি। ... এই প্রথম, তাঁর পদক্ষেপকে (ভোটদানে বিরত থাকা) সমর্থন জানাচ্ছি আমি'। ধনখড়ের শরীরী-ভাষা তখন বলে দিচ্ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কী ভীষণরকম কৃতজ্ঞ তিনি।
ওই ঘটনার পর তিনবছর কেটে গিয়েছে। এবারও সেই জুলাই মাস। উপরাষ্ট্রপতি পদে ধনখড়ের অপ্রত্যাশিত ইস্তফা আর তা নিয়ে জোর জল্পনা। সেই জল্পনার জল কতদূর গড়াবে তা বলা কঠিন। তবে হ্যাঁ, বাংলার রাজভবনে থাকাকালীন এমন একটি কাণ্ড করেছিলেন, যা রাজনৈতিক মহলকে রীতিমতো বিস্মিত করেছিল। ২০১৯ সালের ২৮ অগস্ট আচমকা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পাম অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক হাজির হন। সঙ্গে নেন তাঁর ব্যক্তিগত আলোকচিত্রীকে। ওই ছবি প্রকাশিত হয়। রাজ্যের মানুষ জানতে পারেন, একদা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বু্দ্ধদেব ভট্টাচার্য অসুস্থ হয়ে প্রায় শয্যাশায়ী অবস্থায় রয়েছেন। যা নিয়ে কিঞ্চিৎ বিতর্কও হয়। সাংসদ থাকার সময়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সঙ্গে তাঁর একাধিকবার দেখা হয় বলে জানান ধনখড়। পরের বছর, পুজোর সময়ে ফের সস্ত্রীক বুদ্ধবাবুর পাম অ্যাভিনিউয়ের দু-কামরার ফ্ল্যাটে হাজির হন ধনখড়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে 'লিভিং স্টোনম্যান' বলে অভিহিত করেন।