মণি ভট্টাচার্য: বাংলা অভিধান অনুযায়ী 'অধীর' শব্দের অর্থ অসহিষ্ণু বা ধৈর্যহীন। কিন্তু বাস্তবের অধীর? ঠিক তার উল্টো। সে একটা সময় ছিল মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে আরএসপি দলের প্রভাব। সেসময় বহরমপুরের সাংসদ ছিলেন ত্রিদিব চৌধুরী। ১৯৫২ থেকে টানা ৩২ বছর অর্থাৎ ১৯৮৪ সাল অবধি বহরমপুরের সাংসদ ছিলেন ত্রিদিব চৌধুরী। ১৯৮৪ সালে কংগ্রেস একবার ক্ষমতায় এলেও এরপর কংগ্রেস শাসনকালেও বহরমপুরের কুর্সি দখল করে আরএসপি। এরপর ১৯৯৯ সালে আরএসপির চোখে চোখ রেখে লড়াই করে বহরমপুর দখল করে কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী। সেই শুরু, এরপর থেকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি অধীরকে।
নকশাল আন্দোল, অতিবাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা কালীন বহরমপুরের সাংসদ ত্রিদিব চৌধুরী ছিলেন অধীরের রাজনৈতিক গুরু। এরপর ১৯৮৪ সালে ত্রিদিব চৌধুরী হেরে গেলে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় অধীর রঞ্জন চৌধুরী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দান করেছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নবগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেসসময় রাজনৈতিক চাপে তাঁকে গুম হয়ে থাকতে হয়েছে। নবগ্রামে তার রেকর্ড বাজিয়ে প্রচার চালাত অধীরের অনুগামীরা। এরপর ১৯৯৬ সালে তিনি একই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৯৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান তিনি। বহরমপুর থেকে তিনি ৯৫,৩৯১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলের সাংসদ প্রমোথেস মুখার্জীকে পরাজিত করেছিলেন।২০০৪ সালে, অধীর রঞ্জন চৌধুরীর নেতৃত্বে কংগ্রেস পার্টি ৩৩টি জেলা পরিষদ আসনের মধ্যে ২৩টিতে জয়ী হন, ২৬টি পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে ১৩টিতে জয়ী হন এবং মুর্শিদাবাদের ২৫৪টি গ্রাম পরিষদের মধ্যে ১০৪টিতে জয়ী হন। ২৮ অক্টোবর ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর অধীনে রেলওয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পদে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এরপর রাজ্য, এবং মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের একের পর এক দুর্ঘটনা, ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন কংগ্রেসের অধীর। আস্তে আস্তে বহরমপুর অধীর-পুর হয়ে ওঠে। মানুষ ভালোবাসতে শুরু করে অধীরকে। বহরমপুরে কান পাতলে শোনা যেত অধীরকে ছাড়া বহরমপুরের পাতাও নড়ে না, আর নড়বেই বা কেন, অধীর চৌধুরী নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নয় বিশ্বাস করত ব্যক্তি উন্নয়নে, সেই মত পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে মানুষের। রাত বিরেতে ছুটে গেছেন মানুষের কাছে।
কিন্তু কি পেয়েছেন এসব করে! সিএন -ডিজিটালকে অধীর জানালেন, 'কি পেয়েছি জানা নেই! কিন্তু কখনও নিজের কথা ভাবিনি, মানুষের কথা ভেবেছি। রোজগার নিয়ে ভাবিনি।' আর আজ! ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানের কাছে প্রায় ৮৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে হার নিয়ে অবশ্য কাউকে দোষারোপ করেন নি। হারের পর কোনও অভিযোগ করেননি তিনি। মানুষের রায় মাথা পেতে নিয়েছেন। শুধু আফসোস করেছেন, 'আমি কোনও ধর্মের কাছের লোক হতে পারিনি।' এরপর সামনে কঠিন সময় আসছে তার, সে কথাও স্বীকার করলেন তিনি। অধীর জানালেন, রাজনীতি ছাড়া আর কিছুতে আমার দক্ষতা নেই। তাই আমার জন্য কঠিন সময় আসছে। কীভাবে কাটিয়ে উঠব জানি না।
কিন্তু অধীরের কি এটাই পাওয়ার ছিল! রাজ্যে যখন থেকে ক্ষমতা চ্যুত হয়েছে বামেরা। তখন কংগ্রেসের হাত ধরে ক্ষমতায় বসে তৃণমূল। ওদিকে দিল্লির মসনদে কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায়, রাজ্যে ধুকতে থাকে কংগ্রেস। সে সময়েই সুযোগ বুঝে কংগ্রেস দলের সিংহভাগ নেতা তৃণমূলে যোগ দেয়। সৌমেন মিত্রও কংগ্রেসের হাত ত্যাগ করেন। কেবল মানস ভূঁইয়া, আব্দুল মান্নান ও অধিররা পড়ে থাকেন কংগ্রেসে। রাজ্যে তৃণমূল ঝড় এলেও বহরমপুর কখনও হাতছাড়া হয়নি কংগ্রেসের। ২০১৬ সালে যখন তৃণমূল ফের ক্ষমতায় এল তারপর রাজ্যে কংগ্রেসের মুখ বলতে পড়ে থাকেন কেবল অধীর রঞ্জন চৌধুরী। স্রোতের প্রতিকূলে হেটেও কখনও মাথা নিচু করেননি অধীর। চূড়ান্ত তৃণমূলের সময়েও বহরমপুর অর্থাৎ নিজের গড় শক্ত রেখেছিলেন অধীর। গোটা রাজ্যে তখন একটি কেন্দ্রেই হাত চিহ্ন দেখেছে মানুষ, তখন বাংলায় তৃণমূল, বিজেপি ও অন্যান্য দলের বিরুদ্ধে একা লড়ে গেছেন তিনি। এমনকি ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনেও কংগ্রেসের কোনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাহায্য পাননি অধীর। তবুও দল ছাড়া তো দূর, লড়াই থামিয়ে যাওয়ার কথা কখনও ভাবেননি। বরং সংসদে নানা ইস্যুতে কথা বলেছেন, অংশ নিয়েছেন বিতর্কে। নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে।
দেশে যখন ইন্ডিয়া জোট গঠন হল, তখনও বাংলায় কংগ্রেসকে মাথা ঝোকাতে হয়নি, তাতে অবশ্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রোষের মুখ পড়তে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবন অধীরের। কংগ্রেসকে ভালোবাসেন প্রাণ দিয়ে,পড়ে থেকেছেন ধুলোয়, মাঠে-ঘাটে। ছুটে গিয়েছেন রাজ্যের এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। অথচ অধীরের কথায়, হারের পর তাঁর কাছে হাইকমান্ডের কোনও ফোন আসেনি। কথা হলে পদ ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করবেন তিনি।
গোটা দেশে আপেক্ষিক ভাবে ভালো ফল করেছে কংগ্রেস। কিন্তু রাজ্যে খেই হারিয়ে কংগ্রেসের অবস্থা পিদিম জ্বলার মত। তবুও কংগ্রেসের একনিষ্ঠ সমর্থকরা মনে করেন ওই পিদিমের আলোর লাল অংশটাই অধীর। ২০২৪ লোকসভা ভোট অধীরের কাছে জোর ধাক্কা হলেও তিনি বরাবর স্রোতের বিপরীতেই হেঁটেছেন। এবং জয়লাভ করে নিজেকে সঠিক প্রমান করেছেন। তিনি যে 'অধীর', যার বাংলা অর্থ অসহিষ্ণু বা ধৈর্যহীন। কিন্তু বাস্তবের অধীর যেমনটা দাঁতে দাঁত চেপে, ধৈর্য নিয়ে বাংলার অন্যতম কংগ্রেস মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি তেমনই থাকুন। অন্তত এমনটাই চায় বাংলার রাজনৈতিক মহল। তাঁর মাটি কামড়ে পড়ে থাকার অদম্য জেদ, একা লড়াই করার সাহস জুগিয়েছে, অনেক বিরোধী কর্মীদের, যারা এখনও পর্যন্ত স্রোতের প্রতিকূলে লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের কাছে অধীর অনুপ্রেরণা হয়েই থাকুন।