Updated on : 3 June 2026 | 06:05:23 pm
Updated on : 3 June 2026 | 06:05:23 pm
নাহ্। মাননীয়া সত্যি আপনার দিন ভালো যাচ্ছে না। খারাপ যাচ্ছে। খুবই খারাপ যাচ্ছে। দল ভাঙানির খেলায় নোবেল পুরস্কার থাকলে তা সর্বাগ্রে পেতেন আপনি। অথচ দেখুন, আপনার দলই এখন ভেঙে চুরমার। এমনকি আপনার নিজের হাতে আঁকা ঘাসফুল প্রতীক পর্যন্ত কার্যত হাত-ছাড়া। যদিও কেউ কেউ বলেন, ঘাসফুলের ওই ছবি নাকি আপনার আঁকা নয়, অন্যের আঁকা ঝেড়ে দিয়েছেন। কে জানে সত্যি কি না। তবে, ইস্ট জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যদি পিএইচডি পেতে পারেন আপনি, তাহলে নিরীহ ঘাস-ফুলের ছবি আর কী দোষ করল? আসলে, সত্যের অপলাপ এতটাই মজ্জাগত আপনার, আপনি নিজেকে পর্যন্ত মিথ্যা বলতে দ্বিধা করেন না।
যাই হোক। কাজের কথায় আসা যাক। বিধানসভা ভোটে পরাজয়ের পর আপনি আপনার বাড়িতে যে-বৈঠক ডাকলেন, সেখানে ৮০ জনের মধ্যে মেরে কেটে ২০ জন বিধায়ক হাজির হলেন। আপনি ধর্মতলায় ধর্না দিতে গেলে দলের প্রথম সারির নেতানেত্রীরাই আপনার পাশে এসে গাছতলায় বসলেন না। অন্যদিকে, আপনাকে শুভেন্দু অধিকারীর কটাক্ষ শুনতে হল: 'দলটা এখন ফলতা' হয়ে গেছে।
অধীর চৌধুরী কিন্তু অনেক আগেই আপনারকে সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, বোতল থেকে যে-দৈত্য বার করে দিচ্ছেন আপনি, সেই দৈত্য কিন্তু একদিন আপনার দিকেও তেড়ে যাবে। এ-ও বলেছিলেন, সাপুড়ের মৃত্যু হয় সাপের কামড়েই। কিন্তু সু-পরামর্শো কান দেওয়া আপনার ধাতে নেই। তার চেয়ে চাটুকার পরিবৃত হয়ে 'এপাং-ওপাং-ঝপাং'য়েই আপনার মৌতাত চড়ে।
একবার ভেবে দেখুন, যাঁর সৌজন্যে আপনার দল আজ ভেঙে গেল, বলা ভালো, আপনিই আপনার দল থেকে আউট হয়ে গেলেন, সেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও কিন্তু আদতে আপনার দলের কেউ ছিলেন না। সিপিআই(এম) তাঁকে বহিষ্কার করার পর আপনি তাঁকে সসম্মানে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন। যেমনটা আপনি করে থাকেন আপনি।
কেউ কেউ আপনাকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেও পরে পিছিয়ে আসেন। শুধু বলেন, আপনি মেগালম্যানিয়াক, সুলভ শৌচালয় থেকে শুরু করে শশ্মানঘাটের চুল্লি, সর্বত্র আপনার 'অনুপ্রেরণা'র ছবি। এমনকি, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে, নন্দন চত্বরে শুধু আপনার কাটআউট আর ফ্লেক্স ঝোলে। অবশ্য এমনটাও হতে পারে, আপনি নিজেকে একাধারে আইজেনস্টাইন, পুদোভকিন, দভঝেঙ্কো থেকে শুরু করে ইতালির নিও রিয়ালিজমের অন্যতম স্রষ্টা, বাইসাইকেল থিভস-এর পরিচালক, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র-মননের কারিগর ডি সিকা ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন। হয়তো এই তালিকায় আরও অনেকে আছেন, গদার, ত্রুফো, শ্যাব্রল। ফরাসি নবতরঙ্গেও হয়তো আপনি তরঙ্গিনী হয়ে ওঠেন। প্রসঙ্গত, সদ্য প্রয়াত চলচ্চিত্রকার অনীক দত্ত এর প্রতিবাদ করেছিলেন এবং সেই কারণে আপনার রোষানলে পড়েছিলেন। নন্দন-এ তাঁর ছবি আর মুক্তি পায়নি।
যাইহোক।
শিরোনামের সঙ্গে ছবিটার দিকে নিশ্চয় আপনার নজর পড়েছে এতক্ষণে। এবং, আপনি দিব্যি চিনতেও পেরেছেন দুজনকে: তপন কান্দু ও পূর্ণিমা কান্দু। বছর-চারেক আগে, রাজ্যজুড়ে পৌরসভার ভোটে ১২৫-৩০ টি-র মধ্যে প্রায় সবকটাই আপনার দলের দখলে যায়। যেমনটা আপনি চান আর কি, বিরোধী-শূন্য। কেবল, দুটি পুরসভা যায় বিরোধীদের দখলে। একটি নদিয়ার তাহেরপুর। বামেরা জয়ী হয় সেখানে। আর তার অব্যবহিত পরেই সেখানকার আইসি-কে বদলি করে দেন আপনি। ওই আইসি-র অপরাধ একটাই, তাঁর এক্তিয়ারভুক্ত এলাকায় তৃণমূলের বদলে বিরোধীরা জয়ী হয়েছে। সত্যি তো, এ এক ঘোর অনাচার!
এরপর? পুরুলিয়ার ঝালদা পৌরসভা যায় কংগ্রেসের দখলে। আপনি রাগে গরগর করতে থাকেন। আপনার দল তখন অন্যদল ভাঙাতে শুরু করে। এমতাবস্থায়, নতুন পৌরসভা গঠন হলে চেয়ারম্যান হওয়ার কথা ছিল যাঁর, কংগ্রেসের সেই তপন কান্দু আচমকাই খুন হয়ে যান। ২০২২ সালের ১৩ মার্চের ঘটনা। হইচই পড়ে যায় রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে। তপনের ভাইপো মিঠুন কান্দু একটি অডিয়ো ক্লিপ প্রকাশ্যে আনেন। সেখানে থানার আইসি-কে বলতে শোনা যায়: যে করেই হোক দল ভাঙাতে হবে, কোনও মতেই কংগ্রেসকে পৌরসভা গঠন করতে দেওয়া যাবে না। ভয় এবং উৎকোচ, দুইয়েরই আভাস পাওয়া যায় 'বড়বাবু'র ওই ফোনে। যদিও তাতে শেষরক্ষা হয় না। কংগ্রেস ভাঙানো সম্ভব হয় না। অতএব, তপনকে খুন হতে হয়।
তারপর?
আপনার পুলিস, বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, তখন আপ্রাণ চেষ্টা করে মামলা ঘুরিয়ে দিতে। মানে, ব্যক্তিগত কারণে খুন, অথবা, ডট-ডট-ডট। কিন্তু সিবিআই তদন্তের আর্জি জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তপনের স্ত্রী পূর্ণিমা। আদালত সেই আর্জি মঞ্জুর করে।
এমতাবস্থায়, সিবিআই-এর তদন্তকারী দল পুরুলিয়ার পৌঁছনোর ঠিক আগেই তপন-খুনের অন্যতম সাক্ষীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। যদিও, ন্যায়বিচারের দাবিতে ঝালদার কংগ্রেস তখন ময়দানে নেমে পড়েছে। তপন কান্দুর স্ত্রী পূর্ণিমা কান্দু সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।
এরই মধ্যে তপনের ছেড়ে যাওয়া কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। ওই কেন্দ্রে প্রার্থী হন তপনের সেই ভাইপো মিঠুন কান্দু। কংগ্রেসের জয়ের ব্যবধান বাড়ে ৬ গুণ!
পূর্ণিমা কান্দুকে শুধু একটাই কথা বলতে শোনা যায়, " এই জয় আমার স্বামীর রক্তের জয়"।
তারপর?
নাহ্। তারপরও আপনি ছাড়েননি। কিছুতেই যাতে কংগ্রেস বোর্ড গঠন করতে না-পারে, তার জন্য আইন-বহির্ভূত হেন কাজ নেই যা আপনি করেননি। জনতার রায়ে পৌরসভায় যে-দল সংখ্যাগুরু, সেই কংগ্রেস তখন হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। মামলা চলে। হাইকোর্টের রায় আপনার দলের, বলা ভালো, নির্দিষ্ট করে আপনার বিরুদ্ধে যায়। কী কাণ্ড! সম্রাজ্ঞীর বিরুদ্ধে রায় দিতে সাহস পায় কী করে আদালত, এই মনোভাব নিয়ে আপনি হাইকোর্টের নির্দেশ কার্যত অমান্য করে ঝালদা পুরসভার দখল নেন। কারণ একটাই: বিরোধী-শূন্য করতে হবে বাংলাকে। এমতাবস্থায়, এক অলীক কুনাট্য চলতে থাকে ঝালদা পুরসভাকে ঘিরে। একটু-একটু করে খবরের বাইরে চলে যান নিহত তপন ও তাঁর বিধবা স্ত্রী পূর্ণিমা। বেশ কিছুদিন বাদে, শেষবারের মতো ঝলক দিয়ে ওঠেন পূর্ণিমা কান্দু, নিজের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর হয়ে উঠে!
ব্যস। গল্প শেষ। তপন-পূর্ণিমা অধ্যায়ও শেষ হয়। যদিও, আজ অবধি জানা যায়নি, পূর্ণিমার অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ কী?
এই প্রতিবেদন এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু না, উপসংহারে আরও দু-একটি ঘটনা উল্লেখ করা বড় প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। কারণ, পাবলিক মেমোরি ইজ ভেরি শর্ট। জনগণের স্মৃতি বড় ক্ষণস্থায়ী।
আপনি বহরমপুর পৌরসভা থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেসের জেলা পরিষদ ভেঙেছিলেন যেভাবে, হিটলার-মুসোলিনি দুজনের মিলেও তা পারতেন কি না সন্দেহ। হয় ঘাসফুল এসো, লুঠের টাকা পাবে, নয়তো গরু-পাচার মামলায়, গাঁজা-কেসে সোজা জেলের ঘানি টানো।
মালদাতে তো খাস কোতোয়ালির গনিখান চৌধুরীর পরিবার ভাঙিয়ে মৌসম নুরকে আপনার দলে নিয়ে এসে রাজ্যসভার সাংসদ করে দেন আপনি। অথচ দেখুন, সেই মৌসম কিন্তু ফের ঘরওয়াপসি করেন মোক্ষম সময়। চব্বিশের লোকসভায় অধীর চৌধুরীকে হারাতে আপনার দলের তৎকালীন বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে কাজে লাগান আপনি। রামনবমীর দিন আপনি নাকি নিজ উদ্যোগে একটি দাঙ্গা স্পনসর করেন বলে অভিযোগ অধীর চৌধুরীর। আপনার ভবানীপুরের ব্যর্থ সেনাপতি ফিরহাদ হাকিম সেখানকার মানুষজনকে বলেন: স্বাধীনতার পর থেকে একবারের জন্যও এই কেন্দ্রে (বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে) আপনাদের সম্প্রদায় থেকে কারুকে নির্বাচিত করেননি, এবার অন্তত তা করুন। এই বললে গুজরাত থেকে ভাইজান ইউসুফ পাঠানকে নাকি ৩০ কোটি টাকা পরে। প্রসঙ্গত, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ওই জেলায় সংখ্যালঘু নামের প্রার্থী দেখে ভোট দেওয়ার রেওয়াজ ছিল না এতদিন। একসময়ে আরএসপি-র ত্রিদিব চৌধুরী ও পরে কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী পর-পর লোকসভায় নির্বাচনে জয়ী হন।
এই প্রতিবেদনের শেষটা একটু লঘু তথা তরল হয়ে যাবে জানি, কিন্তু কিছু করার নেই। সাগরদিঘির উপনির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী বাম সমর্থিত বাইরন বিশ্বাসকে আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র উত্তরীয় পরিয়ে তৃণমূলে নিয়ে আসেন। তবু কী দুর্ভাগ্য দেখুন, সকাল থেকে রাত অবধি তরল পদার্থ গলাঃধকরণ করে সেই বাইরন কি না প্রকাশ্যে বলে বসলেন, জেলায় তৃণমূল হারবে, বিরোধীরা জিতবে।
ভাবা যায়!
ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। আর রাজনীতির কল নড়ে বিধানসভায়, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের যখন বাইরে থেকে এসে আপনাকেই আপনার দল থেকে ঘাস-ধাক্কা দিয়ে বার করে দেন।