বামজমানায় সেই যে টাটারা তাদের ন্যানো কারখানা গুটিয়ে চলে গেল, তারপর থেকে আর ভারি শিল্পে বিনিয়োগ করতে কেউ রাজি হল না। তৃণমূল জমানায় বছর-বছর শিল্প সম্মেলনের নামে মোচ্ছব হয়েছে ঠিকই। এবং, সেই মোচ্ছবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন রাখতে ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা বহু কোটি টাকা বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন ঠিকই। তবে, তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এমতাবস্থায়, রাজ্যের বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেই পাখির চোখ করেছে শিল্পকে। আমূল ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছে। রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানান, এছাড়াও, ৪২ জন শিল্পপতি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এবং, প্রত্যেকেই বাংলায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর যে-বাংলা শিল্পে প্রথম সারিতে ছিল, দেশের জিডিপি-তে রীতিমতো অবদান ছিল যে-রাজ্যের, গত পাঁচদশকে সেখানে শিল্পের খরা। বামজমানার শেষের দিকে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এই খরার দশা কাটাতে কম চেষ্টা করেননি ঠিকই। কিন্তু, জমি অধিগ্রহণে প্রশাসনের গা-জোয়ারি মনোভাবে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। সিঙ্গুরে অবশ্য শেষ অবধি তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী মিলে সমঝোতায় আসেন। যাতে করে অনিচ্ছুক কৃষকদের কথাও রাখা যায় এবং একইসঙ্গে সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানাও তৈরি করা যায়। যদিও, আচমকাই কোনও এক রহস্যজনক কারণে ফের বাগড়া দিতে শুরু করেন মমতা। শেষ অবধি সিঙ্গুর থেকে ন্যানো কারখানা গুটিয়ে নিয়ে চলে যান রতন টাটা।
ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও ভারি শিল্প আনতে পারেননি। উপরন্তু, এক-এক করে রাজ্যে একাধিক বাণিজ্যিক সংস্থা তাদের দফতর বা কারখানা গুটিয়ে নিয়ে পাততাড়ি দিয়েছে। ছাব্বিশের বিধানসভার প্রচারে এসে সিঙ্গুরে টাটাদের পরিত্যক্ত ন্যানো কারখানায় সভা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সিঙ্গুরেই টাটারা ফের বিনিয়োগ করবে, এই জাতীয় হাওয়া-গরম করা বক্তব্যের মধ্যে না-গিয়ে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন তিনি, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হলেই শিল্পপতিরা বিনিয়োগ করবে, নচেৎ নয়।
সমঝদারো কো ইশারাই কাফি হোতা হ্যায়। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির হাল পাল্টে দেয়। এক-এক করে রাজনৈতিক দুষ্কৃতী ও তোলাবাজদের গ্রেফতার করা হয়। রাজ্যের কোথাও কোনওরকম গুন্ডাগিরি হলে সরাসরি তাঁকে জানানোর কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এমতাবস্থায়, বাংলায় বিনিয়োগের মাটি এমনিতেই উর্বর হয়। সেইসঙ্গে, রাজ্যের শিল্প ও অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি নীল নকশা তৈরির পরিকল্পনা হয়। অর্থনীতিবিদ ও নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ অশোক লাহিড়ীর উদ্যোগে সেই কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।