রাজ্যের ৭ জন এইআরও-কে সাসপেন্ড করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। এবং তা নিয়ে সোমবার দিনভর উত্তপ্ত থেকেছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল। এমতাবস্থায়, মঙ্গলবার রাজ্যের মন্ত্রী মানস ভুইয়াঁ সাংবাদিক বৈঠক করে তোপ দাগলেন নির্বাচন কমিশনকে। এবং সেই সঙ্গে দাবি করলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে যেভাবে সওয়াল করলেন, তাতে শঙ্কিত হয়েই ৭ এইআরও-কে সাসপেন্ড করল"।
অ্যাকশন মোডে কমিশন?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী কমিশন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও কতটা মানতে বাধ্য, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এমনই এক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যখন বারংবার নবান্নের শীর্ষমহলে আবেদন নিবেদন করে আসছিল, তখন তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়নি। এদিকে শুনানি-পর্বে রাজ্যজুড়ে চরম নৈরাজ্যের ছবি সামনে এসেছে। রাজ্যের ডিজিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে দেশের শীর্ষ আদালত। তাতেও কাজ হয়নি। এমতাবস্থায় রাজ্যের বিরোধী দল থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশ প্রশ্ন তুলছিল, আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন নির্বাচন কমিশন সরাসরি কঠোর পদক্ষেপ করছে না? জাতীয় নির্বাচন কমিশন ও দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কি ঢাল তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সর্দার?
এই পরিস্থিতিতে, অবশেষে কঠোর পদক্ষেপ করতে শুরু করে কমিশন। মনোজ পন্থ মুখ্যসচিব থাকাকালীন যে-চারজন আধিকারিকের নামে এফআইআর করা হয়নি, তাঁদের নামে এফআইআর করতে বর্তমান মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়ে সময়সীমা বেঁধে দেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এবং তার বাইরে, রবিবার রাতে ৭ জন এইআরও-কে সরাসরি সাসপেন্ড করা হয়।
মমতার সওয়ালে শঙ্কিত কমিশন?
এদিন রাজ্যের মন্ত্রী মানস ভুইয়াঁ দাবি করলেন, "এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে কমিশনের বিরুদ্ধে লড়লেন, তাতে শঙ্কিত হয়েই নির্বাচন কমিশন ৭ জন এইআরও-কে সাসপেন্ড করা হয়। এই পদক্ষেপ আদতে প্রশাসনিক সন্ত্রাস"।
প্রসঙ্গত, চলতি মাসের প্রথম দিকে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, 'ইয়োর লর্ডশিপ'! তারপর এক-এক করে তাঁর বক্তব্য রাখতে শুরু করলেন। কী সেই বক্তব্য?
১ পদবী সংক্রান্ত সংশয় ও শুনানিতে ডাক। অর্থাৎ, বাংলায় যাহাই বন্দ্যোপাধ্যায় তাহাই ব্যানার্জি। কমিশন তা বুঝছে না। শুনানিতে ডেকে পাঠিয়ে হয়রান করছে।
২ বিয়ের পর মহিলাদের পদবী বদলায়। তাই, দু-আড়াই দশক আগের তালিকায় যে পদবী ছিল, তা স্বাভাবিক নিয়মেই বদলেছে। কিন্তু কমিশন ডেকে পাঠিয়ে হয়রান করছে।
৩ বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গেলে মহিলাদের ঠিকানা বদলায় নতুন-নতুন নথিতে। আবার একইসঙ্গে রয়ে যায় পুরনো ঠিকানা। অর্থাৎ, বিয়ের আগের ব্যাঙ্কের পাসবইতে যে-ঠিকানা থাকে, বিয়ের পর ব্যাঙ্কের পাসবইতে হয় সেই ঠিকানাই থেকে যায়, নয়তো নতুন অ্যাকাউন্টে সেই ঠিকানা পাল্টায়। এছাড়াও নামের বানান ভুলের বিষয়টি তো রয়েইছে। কমিশন বিষয়টিকে বিবেচনার মধ্যেই আনছে না।
৩ বিহারে এসআইআর-এ এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বলে কোনও শব্দবন্ধ শোনা যায়নি। বাংলার ক্ষেত্রে তা শোনা গেল। বিহারে এক, বাংলায় আর এক। এতজন মাইক্রো অবজারভার কেন? বাংলাকে নিশানা করা হয়েছে।
৪ ইতিমধ্যেই কমবেশি ৫৮ লাখ নাম বাদ পড়েছে (খসড়া তালিকায়)। যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি। এরপরও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলতে থাকছে। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির প্রশ্নে, প্রথম দফায় প্রায় ৩০ লাখ ও দ্বিতীয় দফায় কোটিখানেক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
৫ বাংলাকে নিশানা করা হচ্ছে। বিহারে যা হয়নি, তা এখানে হচ্ছে। সেখানে এতো অবজার্ভারকে দেখা যায়নি। শুধু তা-ই নয়। অসমে কেন এসআইআর হচ্ছে না। শুধু বলা হচ্ছে, আনম্যাপড, আনম্যাচড, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি।