মণি ভট্টাচার্য: একটি ছাত্র আন্দোলনের শক্তি তার নৈতিক অবস্থানে। যখন কোনও আন্দোলন নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শুরু হয়, তখন সাধারণ মানুষের সমর্থনও সেই দাবির ভিত্তিতেই তৈরি হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি সেই আন...
মণি ভট্টাচার্য: একটি ছাত্র আন্দোলনের শক্তি তার নৈতিক অবস্থানে। যখন কোনও আন্দোলন নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শুরু হয়, তখন সাধারণ মানুষের সমর্থনও সেই দাবির ভিত্তিতেই তৈরি হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি সেই আন্দোলনের লক্ষ্য বদলে যায়, যদি মূল ইস্যার পরিবর্তে রাজনৈতিক স্লোগান সামনে চলে আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ কি এখনও ছাত্রদের হাতেই রয়েছে?
NEET প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষোভ অস্বাভাবিক নয়। পরীক্ষার স্বচ্ছতা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং দায় নির্ধারণ এই দাবিগুলিই ছিল আন্দোলনের মূল ভিত্তি। প্রথমদিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি ও পদত্যাগের দাবিই ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন, তাঁর অসুস্থতা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা, সব মিলিয়ে সরকার আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এরপরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হওয়ার মতো অভিযোগ সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের হেনস্তার ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ঘটনা আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এর পাশাপাশি আন্দোলনের কিছু নেতৃত্বের বক্তব্যও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। যেমন আরশোলা বাহিনীর প্রধান অভিজিৎ দীপকের গলায় শিক্ষানীতির প্রশ্ন থেকে আন্দোলনের ভাষা ক্রমশ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগের দাবির দিকে সরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। যদি একটি আন্দোলনের সূচনা হয় পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে, তাহলে তার চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য কি সরকারের পতন? এই প্রশ্নের উত্তর আন্দোলনের নেতৃত্বকেই দিতে হবে।
আরও একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। দিল্লি পুলিশ বিদেশি অর্থায়নের সম্ভাব্য সূত্র খতিয়ে দেখছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তদন্ত চলাকালীন কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশে ছাত্র আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—যে কোনও গণআন্দোলনে বহিরাগত স্বার্থ গোষ্ঠী ঢুকে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন আর শুধু NEET নয়। প্রশ্ন হল, এই আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের, নাকি এমন কিছু রাজনৈতিক বা অন্য শক্তির, যারা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের সুযোগ খুঁজছে?
গণতন্ত্রে আন্দোলনের অধিকার যেমন মৌলিক, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে, দোষীদের শাস্তি দিতে হবে এবং ছাত্রদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের নেতৃত্বকেও স্পষ্ট করতে হবে—তাদের লক্ষ্য পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, নাকি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াই। কারণ ইতিহাস বলছে, যখন কোনও আন্দোলনের মূল দাবি আড়ালে চলে যায় এবং রাজনৈতিক অভিসন্ধি সামনে চলে আসে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই সাধারণ মানুষরাই, যাদের দাবিকে সামনে রেখেই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।