দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী নির্মলা সীতারমন কি বাংলায় এখনও কমিউনিস্টদের ভূত দেখছেন?
এদিন কালনায় দলীয় কর্মসূচিতে এসে সংবাদমাধ্যমের সামনে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে বলতে শোনা গেল, "বাংলায় কমিউনিস্টদের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার"। এবং সেইসঙ্গে তাঁর সংযোজন, "১৯৪৭ সালে দেশের জিডিপিতে বাংলার অবদান কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ছিল। আজ তা ৩ শতাংশে এসে নেমেছ। রুজি রোজগার কী করে হবে? দিদি যতই চেষ্টা করুন বিনিয়োগ আসছে না বাংলায়। বলিউডের শিল্পীরা আসছেন। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা আসছেন না। দিদির পছন্দের অভিনেতা অভিনেত্রীরা আসছেন, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা আসছে না। যতদিন সিন্ডিকেট রাজ চলবে, ততদিন পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা আসবেন না। কর্মসংস্থান তৈরি হবে কী করে? ভিনরাজ্যে কাজ করতে যেতে হবে পরিযায়ী শ্রমিকদের। "
একদা 'বামদুর্গ', অধুনা 'টুকরে-টুকরে গ্যাং'
পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নির্মলা সীতারামন যে-সময়ে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ)-তে পড়াশোনা করেছিলেন, তখন তা কার্যত বাম ছাত্রদের দুর্গ ছিল। সীতারাম ইয়েচুরি থেকে শুরু করে তাবড় বাম-অতিবাম নেতারা তাঁদের রাজনৈতিক পদযাত্রা শুরু করেছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। যদিও, তখন কেন্দ্রে শাসন করতেন যাঁরা, তাঁরা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের 'টুকরে-টুকরে গ্যাং' বলে চিহ্নিত করেননি। বরং, জরুরি অবস্থা জারির জ্ন্য প্রতিবছর জুন মাস এলেই কেন্দ্রের মোদী সরকার যাঁর মুণ্ডুপাত করেন, সেই ইন্দিরা গান্ধীকে তখন বাম ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের থেকে ডেপুটেশন নিতে দেখা গিয়েছিল। সরকার বিরোধিতা আর দেশ বিরোধিতা এক ছিল না তখন, বলছেন পর্যবেক্ষকরা।
বাম-কংগ্রেস
সে দিন চলে গিয়েছে। এখন, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-র সঙ্গে এসএফআই তথা বামপন্থীদের সংঘর্ষ নিয়ম করে শিরোনামে আসে। এবং, সেই সংঘর্ষ থেকেই উঠে আসা ঐশী ঘোষ, দীপ্তিসা ধরকে বাংলার ভোট ময়দানে লড়তে দেখা গিয়েছে, দেখা যাচ্ছে। সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের শাসনকালে, বাম-অতিবামের বিভাজনরেখা অনেকটাই মুছে গিয়েছে। এমনকি, বামেদের সঙ্গে কংগ্রেসের যে-প্রবল বিরোধ ছিল একসময়ে, তা ধীরে-ধীরে অদৃশ্যপ্রায় হয়েছে। কেন্দ্রে ইউপিএ-১ সরকারকে সমর্থন দিয়ে 'অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি' নেওয়াতে পেরেছে বামেরা। 'খাদ্য সুরক্ষা আইন' থেকে শুরু করে 'একশো দিনের কাজ (সদ্য বিলুপ্ত মনরেগা)' ও 'তথ্যের অধিকার আইনে'র মতো অনেক মাইলস্টোন তৈরি হয়েছে দিল্লিতে, বাম-কংগ্রেস জোটের সৌজন্যে।
আর, তারও কয়েকযুগ আগে যদি ফিরে যাওয়া যায়, তাহলে চোখে পড়ে: নেহেরুর মিশ্র অর্থনীতি তথা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি এবং ইন্দিরা গান্ধীর ব্যাঙ্কজাতীয়করণের মতো ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
বামেদের পথেই মমতা?
পর্যবেক্ষকরা এ-ও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বিজেপির এক তাত্ত্বিক নেতা একবার বলেছিলেন, সিপিএম তথা বামেদের সেরা ছাত্রী যদি কেউ থেকে থাকেন, তাহলে তাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বামপন্থী অর্থনীতিবিদরা পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হন, যেভাবে ১০৫ টি সরকারি প্রকল্প বা কর্মসূচি চালাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার, তা কিন্তু বামপন্থার সঙ্গেই যায় বেশি, দক্ষিণ বা অতি দক্ষিণপন্থার সঙ্গে একেবারেই নয়। বামজমানায় যখন রাস্তায় নেমে জঙ্গি আন্দোলন করতেন মমতা, তখন সেই মমতাকে 'বামপন্থী' তকমা দিয়েছিলেন সিপিআই-এর প্রবীণ নেত্রী গীতা মুখোপাধ্যায় পর্যন্ত। এবং, সাদামাটা জীবন-যাপন, আটপৌরে শাড়ি, ঠোঙায় মুড়ি-তেলেভাজা, সবমিলিয়ে বামঘরানার উত্তরাধিকার বহন করেই কিন্তু ক্ষমতায় এসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যখন, ক্ষমতায় থাকা বামনেতাদের অনেকেই তাঁদের টেমপ্লেট বদলে ফেলে বিলাসী জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে, নির্মলা সীতারামনের মতো মেধাবী অর্থনীতিবিদ বাংলায় মমতার হ্যাটট্রিক করার রহস্যময় রসায়ন ধরে ফেলবেন, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে? বাংলা এমনই এক রাজ্য, যেখানে কট্টর সিপিএম-বিরোধী, এমনকি, কট্টর নকশাল-বিরোধীর ডিএনএ-র রং-ও লাল! তাছাড়া, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ভালোই জানেন, তথাকথিত উন্নয়নকে মানবকল্যাণ-সূচকের মাপকাঠিতে বিচার করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন আধুনিক বিশ্বের যে কয়েকজন অর্থনীতিবিদ, তাঁদের অন্যতম অমর্ত্য সেন এমনি-এমনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায় হাত রাখেননি।