স্বামীর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ এ-দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে সে অর্থে নতুন কিছু নয়। একদা যে-সনিয়া গান্ধী রাজনীতির ধারপাশ দিয়েও হাঁটেননি, রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর তাঁকেই কংগ্রেসের রাশ ধরতে হয়েছিল। ১৯৯১ ও ২০০৪ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে গান্ধী পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিল দলের একটা বড় অংশ। যদিও, সে পথে হাঁটেননি তিনি। তাই, একানব্বই সালের লোকসভা নির্বাচনের পর একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবেই কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নরসিমা রাও। এবং, ২০০৪ সালে 'অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার' হয়েছিলেন মনমোহন সিং।
নব্বইয়ের দশকে, বিহারে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে লালুপ্রসাদ যাদবকে যখন গ্রেফতার করেন সিবিআই-কর্তা উপেন বিশ্বাস, তখন পাটলিপুত্রের 'তখত্' দখল করেন লালু-পত্নী রাবড়ি যাদব। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তখন এক-আলোবর্ষ থেকেও দূরে ছিল।
আর বঙ্গ রাজনীতিতে?
সত্যি কথা বলতে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, বঙ্গ রাজনীতিতে সেই চল সেভাবে ছিল না বললেই চলে। যদিও, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চুটিয়ে রাজনীতিতে করেছেন, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। যেমন সিপিআই-এর গীতা মুখোপাধ্যায় ও তাঁর স্বামী বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু, সে ক্ষেত্রে স্বামীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজনীতিতে আসেননি সিপিআই নেত্রী ও পাঁশকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের সাতবারের সাংসদ গীতা মুখোপাধ্যায়। বরং, রাজনীতির ময়দানেই বিশ্বনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও তারপর বিবাহ।
নব্বই দশক, প্রিয়-দীপা
নব্বইয়ের দশকে, একটু বেশি বয়সেই কৌমার্য ভঙ্গ করেন কংগ্রেসের প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী। গ্রুপ থিয়েটার ও ছোট পর্দার অভিনেত্রী দীপা-র সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। বছরদশেক বাদে, প্রিয়রঞ্জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভরতি হন। এবং দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে ভেন্টিলেশনের থাকেন। ইতিমধ্যেই রাজনীতির ময়দানে নেমে পড়েন দীপা। প্রথমে গোয়ালপোখর বিধানসভা ও পরে রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে জয়ী হন প্রিয়রঞ্জনের ঘরনি।
সোমেন-শিখা
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে যে-ইতিহাস তৈরি করেন একদা যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পরবর্তীকালে বাংলায় কার্যত সাইনবোর্ডে পরিণত হয় কংগ্রেস, তার দায় কিন্তু আমহার্স্ট স্ট্রিটের 'ছোড়দা' সোমেন মিত্রর ওপরই বর্তায়। সোমেন-মমতার রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। কিন্তু, বামজমানার পতনের মুখে, ২০০৯ সালে তৃণমূলের সমর্থনে লোকসভায় দাঁড়ান ও জয়ী হন সোমেন। স্ত্রী শিখা মিত্র তখন দাবি করেন, দল (কংগ্রেস) তাঁর স্বামীকে যথাযথ সম্মান দেয়নি। এরপর, পরিবর্তন-পরবর্তী জমানায়, নির্বাচনী ময়দানে নামেন শিখা। এবং, সোমেন-ঘরনি হয়ে ওঠেন তৃণমূলের ঘরের মেয়ে ।
সুদীপ-নয়না
কংগ্রেস রাজনীতিতে প্রিয়রঞ্জনের সমসাময়িক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বিয়ে করেন অভিনেত্রী নয়নাকে। তরুণ মজুমদারের 'পথভোলা' দিয়ে নয়নার অভিনয় জীবনের শুরু। সুদীপের সঙ্গে পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর রাজনীতিতে আসেন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের টিকিটে জয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধিও হন। যদিও, প্রিয়-দীপা ও সোমেন-শিখার চেয়ে সুদীপ-নয়না জুটি কিছুটা অন্যরকম বলেই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
দিলীপ-রিঙ্কু
অনেকটা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর মতোই, একটু বেশি বয়সেই সম্প্রতি কৌমার্য ভঙ্গ করেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। রাজনৈতিক মহলে একটা চালু রসিকতা রয়েছে, ভাগ্যিস দল তাঁকে কোণঠাসা করেছিল, নইলে এই বয়সে রিঙ্কুর সঙ্গে মালাবদলের সুযোগ হয়তো আর হয়ে উঠতো না দিলীপের। প্রসঙ্গত, চব্বিশের লোকসভায় তাঁর নিজের আসন থেকে তিনি বিজেপির টিকিট পাননি এবং অন্য আসনে লড়তে গিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। দলের নাক কেটে দিলীপের যাত্রাভঙ্গ করেছিলেন বঙ্গবিজেপির হাইপ্রোফাইল এক নেতা। এমতাবস্থায়, দলে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েন দিলীপ। এবং ইকোপার্কে মর্নিং ওয়াকের সঙ্গী রিঙ্কুর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন একদা রাজ্যবিজেপির সভাপতি ও সাংসদ দিলীপ ঘোষ।
প্রিয়-দীপা, সোমেন-শিখা-র পথ ধরেই এবার বঙ্গ রাজনীতিতে দিলীপ-রিঙ্কু জুটি নিয়ে জল্পনা চলছে রাজনৈতিক মহলে। এবং তা যে-সে জল্পনা নয়, একেবারে হাইপ্রোফাইল জল্পনা। ছাব্বিশের হাইভোল্টেজ বিধানসভায় বিজেপির প্রার্থীপদ পেতে নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন রিঙ্কু, একেবারে বায়োডাটা-সহ। সূত্রের খবর, একদা তাঁর স্বামীর নির্বাচনী ময়দান মেদিনীপুরের কোনও আসনে প্রার্থী হতে চান তিনি। নইলে, যে মর্নিং ওয়াকে দিলীপের সঙ্গে পরিচয়, প্রণয় ও পরিণয়, সেই নিউটাউন অঞ্চলের কোনও বিধানসভা আসনে বিজেপির টিকিটে লড়তে পারেন তিনি। এবং, সে ক্ষেত্রে রথের সারথী হিসেবে কৃষ্ণের ভূমিকা নিতে পারেন দিলীপ ঘোষ।
রিঙ্কুর জয় আদতে দিলীপেরই জয়। এবং, রিঙ্কুর পুণ্যেই দিলীপের পুণ্য। দলের ভিতরে, দলের বাইরে।