অপরাধ তখনই কমে, যখন অপরাধীরা ভয় পায়। এবং, অপরাধীরা ভয় পায় তখনই, যখন সরকার জিরো টলারেন্স নীতিতে চলে।
বারুইপুরে নাবালিকাকে গণধর্ষণের পর জীবন্ত অবস্থায় বস্তায় পুরে পুকুরে ফেলে দেওয়ার অভিঘাত তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এমতাবস্থায়, ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টার নিয়েও বিতর্ক প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর পথে নামছে। অন্যদিকে, প্রাক্তন পুলিস কর্তারা প্রশ্ন তুলছেন, মূল সাক্ষী যদি ‘খরচ’ হয়ে যায়, তাহলে তদন্ত এগোবে কী করে?
পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলছেন, এনকাউন্টারের দিকেই হেলে রয়েছে জনমত। এবং, যাঁদের ঘরে মেয়ে চলে গেছে, যাঁদের স্কুল-কলেজের বন্ধু নির্যাতিত হয়েছে, তাঁরা আরও বেশি করে এনকাউন্টের পক্ষে সওয়াল করছেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গত ১৫ বছরের তৃণমূল জমানায় পশ্চিমবঙ্গ যেভাবে অপরাধীদের অভয়-অরণ্যে পরিণত হয়েছিল, তাতে করে এই কড়া দাওয়াই দেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই।
তৃণমূল জমানায় পার্কস্ট্রিট দিয়ে শুরু হয় ধর্ষণ-কাণ্ড। মন্ত্রী মদন মিত্র দাবি করেন, খদ্দেরদের সঙ্গে দরাদরি চলছিল ওই মহিলার, তার বেশি কিছু নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ধর্ষণ হয়নি। এমতাবস্থায়, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দাবি খারিজ করে দিয়ে আইপিএস দময়ন্তী সেন স্পষ্ট জানান, হ্যাঁ, ধর্ষণ হয়েছে। এরপর দময়ন্তীকে নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠিয়ে অপমান করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং, এমন দক্ষ ও সৎ একজন পুলিস অফিসারকে কার্যত বসিয়ে দেন।
এখানেই শেষ নয়। মধ্যগ্রামে গণধর্ষিতা যুবতীকে শেষ অবধি পুড়িয়ে মারে দুষ্কৃতীরা। কামদুনিতে কলেজ পড়ুয়া যুবতীকে বাড়ি ফেরার পথে গণধর্ষণ করে দু-পা চিড়ে রেখে পরিত্যক্ত জমিতে ফেলে রাখা হয়। এবং, ঘটনা ঘটতেই থাকে। শেষ অবধি যার ভয়ানক পরিণতি দেখা যায় আরজিকরকাণ্ডে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গত ১৫ বছরে ধর্ষক ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করার বদলে তাদের প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। আর সেই কারণেই পরিবর্তিত জমানায় এনকাউন্টারের পক্ষে জনমত প্রবল।
এদিন ভোটের আলো ফোটার আগেই বারুইপুরকাণ্ডে অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুর খবর চাউর হয়ে যায় বারুইপুরে। এবং, এনকাউন্টারে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রভাসের মায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিস্মিত হয়ে যায় নাগরিক সমাজ। ছেলের সপক্ষে বলা তো দূর অস্ত, মা সন্ধ্যা মণ্ডল পুলিসকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, প্রভাসের মরদেহ পর্যন্ত দেখতে রাজি নন তিনি। সংবাদমাধ্যমমে তাঁর প্রতিক্রিয়া, “ও নিজের কর্মফল পেয়েছে। যা করেছে তার ফল পেয়েছে। ভালোই হয়েছে”।
এমতাবস্থায়, কামদুনিকাণ্ডের প্রতিবাদী মুখ সৌসুমী কয়ালের বক্তব্য, “ধর্ষকের সাজা হয়েছে। এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। বিগত সরকার ১৫ বছর ধরে ধর্ষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কামদুনি মামলায় দোষীরা খালাস পেয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ধর্ষকদের খরচ করে দেওয়া হবে, ঠিক তা-ই হয়েছে। মন থেকে শান্তি পেলাম। আমরা আশ্বস্ত হলাম। রাজ্যের বুকে ধর্ষকদের আর জায়গা নেই। বাকিদের ৩ জনকেও এনকাউন্টার করে দেওয়া হোক। মেয়েরা যাতে স্বাধীনভাবে চলতে পারে, নতুন একটা বাংলা যেন তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, ফের কামদুনি ফাইলস খোলা হোক। তদন্ত হোক। দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পাক”।
নদিয়ার কালীগঞ্জে তৃণমূলের বিজয় মিছিল থেকে ছোড়া বোমার আঘাতে মৃত্যু হয় কিশোরী তমান্নার। তমান্নার মা সাবিনা বলেন, “অপরাধীরা এবার ভয় পাবে। অপরাধ করার আগে আর একবার ভেবে দেখবে। আগের সরকার যেভাবে অপরাধীদের পাশে থাকত, তাতে তারা যা ইচ্ছে করে পার পেয়ে যেত। তারা জানত, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে শেষ অবধি তাদের গায়ে আঁচড়টি পর্যন্ত লাগবে না। এবার, বারুইপুরের এনকাউন্টারে অপরাধীরা অপরাধ করার আগে আর একবার ভেবে দেখবে”।