বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা গোটা রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এমন বর্বরোচিত অপরাধের পর সাধারণ মানুষের প্রথম প্রত্যাশা থাকে দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেফতার এবং কঠোরতম শাস্তি। সেই প্রেক্ষাপটে অন্যতম অভিযুক্তের পুলিশি এনকাউন্টার এবং সরকারের পরবর্তী অবস্থান ঘিরে এখন রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু এনকাউন্টার নয়, তার থেকেও বড় প্রশ্ন সরকার কি সত্যিই অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে?
বারুইপুর কাণ্ডের তদন্তে প্রথম থেকেই প্রশাসনের তৎপরতা লক্ষ করা যায়। বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন, একের পর এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার, ঘটনাস্থলে পুনর্নির্মাণ, পুলিশের দাবি অনুযায়ী অভিযুক্তের পালানোর চেষ্টা এবং তার জেরে এনকাউন্টার— গোটা ঘটনাপ্রবাহ প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। এরপরই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে মতাদর্শের সংঘাত।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে বিজেপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল "ভয় আউট, ভরসা ইন" সরকার সেই প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন করছে। তাঁর কথায়, ধর্ষক বা খুনির কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নেই, তাদের জায়গা হয় জেলের ভিতরে, নয়তো আইনের কঠোরতম শাস্তির মুখে অর্থাৎ আকাশে। শমীক আরও দাবি করেন, অতীতে বহু গুরুতর অপরাধ রাজনৈতিক কারণে চাপা পড়েছে বা অপরাধীরা রক্ষা পেয়েছে। সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আপসহীন পদক্ষেপই এখন সরকারের লক্ষ্য। কামদুনি-কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা নিছক রাজনৈতিক আক্রমণ নয়; বরং অতীতের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, যদি পুরনো মামলাগুলির পুনর্মূল্যায়ন হয়, তবে বহু প্রশ্নের উত্তর সামনে আসতে পারে। এই দাবি কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময় বলবে। তবে অতীতের বিচারব্যবস্থা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একই সুর শোনা গিয়েছে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের বক্তব্যেও। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবে না। তাঁর মতে, তদন্ত চলাকালীন যদি কোনও অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করে বা পুলিশের উপর হামলা চালায়, তবে আইন অনুযায়ী পুলিশ আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে। এনকাউন্টারের সমালোচকদের উদ্দেশে তাঁর পাল্টা প্রশ্ন ধর্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের বিরোধিতা করে তাঁরা কী বার্তা দিতে চাইছেন?
অন্যদিকে, এই ধরনের ঘটনায় আইনের শাসন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রশ্নও উঠে আসছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতের মাধ্যমে বিচার হওয়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পুলিশ যে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছে, সেই দাবি এখন বিচারবিভাগীয় তদন্তের আওতায় রয়েছে। ফলে এই ঘটনার চূড়ান্ত মূল্যায়ন তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার উপরই নির্ভর করবে। কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়াই গণতান্ত্রিক রীতি।
তবে এটাও সত্য, বারবার নারী নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের একাংশ বহুদিন ধরেই দ্রুত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে এসেছে। সেই জনমতের প্রতিফলন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যেও অতীতে দেখা গিয়েছে। ফলে বারুইপুরের ঘটনাকে ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার নেপথ্যে শুধু দলীয় অবস্থান নয়, সমাজের এক বৃহৎ অংশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগও কাজ করছে।
সবশেষে, একটি বিষয় স্পষ্ট বারুইপুর কাণ্ড শুধুমাত্র একটি অপরাধমূলক মামলা নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। সরকার যদি সত্যিই অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ, দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নীতি অনুসরণ করে এবং একই সঙ্গে আইনের শাসন ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে পারে, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় বার্তা। কারণ কোনও সভ্য সমাজে অপরাধীর প্রতি কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনই বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুইয়ের ভারসাম্যই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্ধারণ করে।