বামফ্রন্ট সরকার ৩৪ বছরে যে-পরিমাণ ঋণ করেছিল, পরবর্তীকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ১৫ বছরে তার চারগুণ ধার করেছিল।
এখানেই শেষ নয়।
দুর্গাপুজোয় সরকারি অনুদান, ইমামভাতা, পুরোহিত ভাতা এবং ভোট-বান্ধব প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করত তৃণমূল সরকার। শেষ অবধি রাস্তা সারানোর পয়সাও থাকত না রাজকোষে। এমতাবস্থায়, রাজকোষ ভরতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরসা ছিল মদ ও মদের দোকান। দু-হাত অন্তর-অন্তর পানশালা বাংলার সংস্কৃতি হয়ে উঠেছিল।
এই পরিস্থিতিতে, রাজ্যের বিজেপি সরকার যখন ক্ষমতায় এল, তখন তাদের লক্ষ্য হয়ে উঠল তৃণমূল জমানার গোল শোধ করা। গোল দেওয়া তো তার পরের কথা।
ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত তাঁর প্রথম বাজেট পেশ করলেন খুব সাবধানী হয়ে। সেখানে কোনও লম্বাচওড়া প্রতিশ্রুতি ছিল না। বরং, অভাবের সংসারে কী করে ভাঁড়ার ভরতি করা যায়, সেই লক্ষ্য নিয়েই এবারের বাজেট পেশ হল।
রাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে এদিন বিধানসভায় বক্তব্য রাখলেন স্বপন দাশগুপ্ত। একাধিক ক্যাগ রিপোর্ট পেশ করলেন। যা পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে পেশ করা হয়নি। এবং, কার্যত কারুর উপরেই করের বোঝা না-চাপিয়ে অন্য পথে রাজস্ব বৃদ্ধির কথা ভাবলেন।
কোন পথে?
সরকারি ক্ষেত্রে যতজন কাজ করেন, তার চেয়ে বহুগুণ মানুষ কাজ করেন বেসরকারি ক্ষেত্রে। এবং, সেই বেসরকারি ক্ষেত্রের মধ্যে একটা বড় অংশই কিন্তু অর্থনীতির পরিভাষায় ‘ইনফর্মাল সেক্টর’। যেখানে দক্ষ শ্রমিক থেকে শুরু করে অনেকই কাজ করেন। অর্থমন্ত্রী বললেন, “ইনফর্মাল সেক্টরকে ফর্মাল অর্গানাইজড সেক্টরে আনতে চাই। রাজস্ব বাড়বে। আপাতত যা ট্রেন্ড, তাতে করে ১৮ শতাংশ রাজস্ব বাড়বে”।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সস্তার চমক না-দিয়ে রাজ্যের অর্থনীতিকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে পুনরুজ্জীবিত করার পথে হাঁটা শুরু করল রাজ্যের বিজেপি সরকার। পর্যবেক্ষকরা মনে করালেন, বাংলার অর্থনীতির হাল ফেরাতে বাজেট পেশের ঠিক আগেই দিল্লি গিয়ে দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ও নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ কৌশিক লাহিড়ীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন স্বপন দাশগুপ্ত। এবং, তার আগে থেকেই কেন্দ্রীয় সরকাররে সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছিল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। বাংলার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিরাট অঙ্কের প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। এবং, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে লড়াই করে গাত্র ব্যথার পথে না-হেঁটে, সহযোগিতার পথ নিয়েছে রাজ্য সরকার। সেই কারণে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের যে-অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তৃণমূল সরকারের আমলে, দুর্নীতির কারণে, ফের তা চালু হচ্ছে।
বাংলার পুনরুজ্জীবন
রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত দিল্লি গিয়ে দেড়হাজার কোটি প্যাকেজ আদায় করে এনেছেন। তারপর থমকে থাকা প্রকল্পের রূপায়ণের জন্য কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েত ও কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের মুখোমুখি হয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এবার, ১২৫ দিনের কাজে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের টাকা দ্রুত বরাদ্দ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইউপিএ জমানায় তৈরি মনরেগা বা ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প সম্প্রতি বদলে গিয়েছে। ১০০ দিনের জায়গায় ১২৫ দিনের কাজের গ্যারান্টি দিয়ে তৈরি হয়েছে ভিবি-জি রাম জি (বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন গ্রামীণ)। কেন্দ্র ও রাজ্য কে কত শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করবে, সেই সমীকরণও পাল্টেছে। সূত্রের খবর, এই প্রকল্পে বাংলার জন্য যে-পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা ১৪ হাজার কোটিরও বেশি! এবং সেই হিসেবে, প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত পাবে ৫ কোটি টাকা!
এদিকে রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তাপস রায় দাবি করেছেন, তাঁর সঙ্গে ৪০ জনেরও বেশি ব্যবসায়ী-শিল্পপতি যোগাযোগ রেখে চলেছেন। যাঁরা রাজ্যে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। সর্বোপরি, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, রাজ্যে ফিরছে টাটা গোষ্ঠী—বড়সড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে।