বাংলার দ্বিতীয় দফার ভোটে সকাল-সকাল সর্ব-তীর্থ কালীঘাটে যা দেখা গেল, তা রামকৃষ্ণের কালী-দর্শনের মতোই বিরল ও রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা!
এদিন নিজের পাড়া থেকে একপ্রকার বেঞ্চি-ছাড়া হতে হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এবং, পুলিসের কোনও বড় কর্তা নন, খুব সম্ভবত সাব ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার এক আধিকারিক সোজা গিয়ে কার্তিককে উঠিয়ে দিলেন!
এবার থেকে তো চরম নাস্তিক পর্যন্ত কালীঘাটের স্থান-মাহাত্ম্য স্বীকার করে নেবেন! মনে করছেন ধর্মতাত্ত্বিক থেকে শুরু করে রাজতাত্ত্বিক, সবাই।
নিজের পাড়ায় বেঞ্চিতে বসে আড্ডা মারছেন স্বয়ং কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিস শুধু যে তাঁকে উঠে যেতে বলল, তা-ই নয়, কার্তিককে কথা বাড়াতেই দিল না!
কথোপকথন
(পুলিস কর্মী বা আধিকারিক কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে উঠে যেতে বলছেন)
কার্তিক: এটা আমাদের পাড়া, এটা আমাদের ক্লাব...
পুলিস: আপনাকে সারাবছর বলব না। শুধু আজকের দিনের জন্য। চারজনের বেশি কোথাও কেউ বসবে না। বুথের কাছে।
কার্তিক: এটা আমাদের অফিস...
পুলিস: কোনও অফিসেই চারজনের বেশি থাকবে না কেউ আজকে। এটা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ।
অগত্যা হাল ছাড়লেন কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বেঞ্চি ফাঁকা হতে শুরু করল। এরপর সটান তৃণমূলের শিবিরে গেল পুলিস, "চারজনের বেশি থাকবে না আজকে"। অগত্যা 'দিদি'র পাড়ার তৃণমূল শিবির থেকে উঠে যেতে হল 'ভাই'দের।
১০ বছর আগে, সৌমেন মিত্র-র জমানা
২০১৬-র বিধানসভা ভোট। নির্বাচন কমিশন কলকাতার পুলিস কমিশনার হিসেবে রাজীব কুমারকে সরিয়ে নিয়োগ করলেন সৌমেন মিত্রকে। রাজ্যের আইপিএস মহলে সৌমেন মিত্রর সততা ও দক্ষতা প্রশ্নাতীত। কমিশনের নির্দেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করেছিলেন তিনি। কলকাতায় ভোটের দিন খবর এসেছিল, ভবানীপুর বিধানসভায় খাস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তল্লাটে একটি ক্লাব খোলা রয়েছে এবং সেখানে অনেকে মিলে জটলা করেছে। খবর পেয়েই সৌমেন মিত্রর নির্দেশ, এখনই ওই ক্লাবে গিয়ে তালা বন্ধ করে দিয়ে আসতে হবে। এবং, মিত্রসাহেব (অধস্তন কর্মী আধিকারিকদের কাছে এই নামেই পরিচিত ও সম্মানিত) নির্দেশ দিয়েছেন, অতএব সঙ্গে-সঙ্গে পালন করতে হবে। পুলিস গিয়ে সোজা ক্লাবের দরজায় তালা লাগিয়ে এল!
যদিও, ক্ষমতায় ফিরেই সৌমেন মিত্রকে কলকাতার পুলিস কমিশনারের পদ থেকে অপসারিত করলেন মমতা। এবং, কমপালসরি ওয়েটিং-সহ আর কী-কী শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা যার তাঁর বিরুদ্ধে, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু হল।
প্রসঙ্গত, সেবার কলকাতার ভোটে পাটুলি-মুকুন্দপুর সংলগ্ন এলাকায় অশান্তির খবর পেয়ে সোজা কমান্ডো নামিয়ে দেন সৌমেন মিত্র। সাঁজোয়া-গাড়ি তখনও ঢোকেনি কলকাতায়।
এহেন আধিকারিককে যখন কোণঠাসা করে দেওয়া হয়, তখন বাংলা থেকে প্রকাশিত এক ঐতিহ্যময় সাহিত্য ও প্রবন্ধের পত্রিকা তাদের কভার স্টোরিতে সৌমেন মিত্রের ছবি দিয়ে তলায় তাঁর পরিচয় দেন: পুলিস কমিশনার, নির্বাচন কমিশন।
পরবর্তীকালে, এই সোমেন মিত্রকেই কলকাতার পুলিস কমিশনার করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সৌমেন মিত্রর কথা মনে করে পর্যবেক্ষকরা আজও বলেন: একেই বলে সততার জোর!