তপন সিংহের সেই ছবির নাম একটু অদলবদল করে নিলে এই গল্পের নাম দেওয়া যেতে পারে 'এক যে ছিল বুথ'। কারণ, জাদুবাস্তব বা ম্যাজিক রিয়েলিটি ছাড়া এহেন ধাঁধার সমাধান করা অসম্ভব। রাজ্যে এসআইআর পর্ব যখন মধ্যগগনে, তখন এমনই একটি বুথের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যেখানে ৫১৭ জন ভোটারের মধ্যে একজনেরও জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর খবর নেই!
না, এখানেই শেষ নয়। এর চেয়েও বড় বিস্ময় হল, তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম সবাই একসঙ্গে বলছে: হেথায় কোনো ভোটারের মৃত্যু হয়নি!
কোথায় ঘটেছে এমন মিরাকেল?
পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল। চন্দ্রকোনা পৌরসভার ১২ টি ওয়ার্ডে মোট ২১ টি বুথ রয়েছে। এখানকার ২০ টি বুথ মিলিয়ে মৃত ভোটারের সংখ্যা ২৪৯ জন। কেবল ১৪৮ নম্বর বুথেই নেই কোনো মৃত ভোটার। দেখা যাচ্ছে, ওই বুথে ৫১৭ জন ভোটার আগের মতোই রয়ে গিয়েছেন।
মৃত সঞ্জীবনী সুধা?
না। এর রহস্য লুকিয়ে রয়েছে অন্যত্র। নিবিড় সংশোধনীর কাজ দু-আড়াই দশক অন্তর হলেও, নির্বাচন কমিশন প্রতিবছরই নিয়ম করে খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। আর সেই কাজ করেন বিএলও-রা। এই ১৪৮ নম্বর বুথের বিএলও বিকাশ লাহা দৃশ্যতই আত্মবিশ্বাসী, "আমার বুথের ভোটার তালিকা পুরো যাচাই করা হোক, কোনো অসুবিধা নেই। আমি ২০১২ সাল থেকে এই কাজ করছি। আমার বুথে কেউ মারা গেলে ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে আমি সেই বাড়িতে যাই। খোঁজখবর নিই। তারপর নাম বাদ দিই। এসআইআর শুরু হওয়ার কিছুদিন আগেই আমার বুথে দু-জনের মৃত্যু হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে ওই দুজনের নাম বাদ দিয়ে দিই। পৌরসভার দেওয়ার ডেথ সার্টিফিকেট আর ভোটার তালিকা পাশাপাশি ফেললেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। এ নিয়ে কোনো ভাবনা বা দুর্ভাবনা নেই আমার"।
এই বুথের গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা উত্তম হাতি দেড়বছর আগে মারা যান। ওই বাড়িতে গিয়ে মৃতের স্ত্রী বন্দনা হাতিকে প্রশ্ন করলে উত্তর আসে, "এসআইআর শুরুর আগেই তাঁর স্বামীর নাম ভোটার তালিকা বাদ দিতে বাড়িতে আসেন বিএলও। ওই নাম এখন আর ভোটার তালিকায় নেই"।
কী বলছে তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম?
তৃণমূলের বিএলএ কাঞ্চন আশ জানান, "বুথে যতজন মৃত ভোটার ছিল বিএলও সেসব এসআইআর এর আগেই বাদ দিয়েছেন, তাই স্বাভাবিকভাবেই এখন তালিকায় শুন্য দেখাচ্ছে"। বিজেপির বিএলএ শীর্ষেন্দু খাঁ-র মুখেও একই কথা, "বিএলও ভালো কাজ করেছেন, আমরাও সাহায্য করেছি। বিএলও এখানে নতুন নন। তাই, মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে আগেই"। সিপিএমের বিএলএ পাঁচু লাহার মুখেও একই কথা, "এখানে কাজ খুব ঠিকঠাক হয়েছে। মৃত ভোটারের নাম তালিকায় নেই"।
চন্দ্রকোনা-২ ব্লকের বিডিও উৎপল পাইক বলেন, " ১৪৮ নম্বর পার্টে আমরা একটাও ডেথ খুঁজে পাইনি। তবুও খতিয়ে দেখছি"।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটার তালিকায় মৃত-ভোটারের নাম রাখা নিয়ে যখন রাজ্যজুড়ে হইহই পড়ে গিয়েছে, তখন চন্দ্রকোনার এই বুথ যেন বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কণ্ঠে
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সেই গান মনে পড়ে যাচ্ছে, "ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সঙ্গীত ভেসে আসে..., বলে আয়রে ছুটে আয়রে ত্বরা, হেথা নাইকো মৃত্যু নাইকো জরা"।
সরাসরি ঘাটাল লোকসভার অন্তর্গত না-হলেও, চন্দ্রকোনা বিধানসভার অবস্থান কিন্তু সে অর্থে 'দেব'ভূমির কাছেই, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়।