বিলম্বিত বোধোদয়? চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুরের পাঁচবারের কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী পরাজিত হন। এবং সেই পরাজয়ের নেপথ্যে থাকে অধুনা তৃণমূলের সাসপেন্ড হওয়া বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের অতি-সা...
বিলম্বিত বোধোদয়?
চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুরের পাঁচবারের কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী পরাজিত হন। এবং সেই পরাজয়ের নেপথ্যে থাকে অধুনা তৃণমূলের সাসপেন্ড হওয়া বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের অতি-সাম্প্রদায়িক মন্তব্য: ওরা (হিন্দুরা) এখানে ৩০ শতাংশ, আমরা (মুসলিমরা) ৭০ শতাংশ, চাইলে ওদের (হিন্দুদের) ভাগীরথীর জলে ফেলে দিতে পারি।
বছর দেড়েক পর, সেই হুমায়ুন কবীর নিজের দল (জনতা উন্নয়ন পার্টি) তৈরি করে ওই সাম্প্রদায়িক হুমকির জন্য হিন্দুদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। এবং দাবি করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শেই সেদিন তাঁর ওই মন্তব্য। এরপর ১ মাসও কাটেনি। এদিন মুর্শিদাবাদে এক সাংবাদিক বৈঠকে আরও এক ধাপ এগিয়ে হুমায়ুনের মন্তব্য, "ইউসুফ পাঠানের মতো ফালতু লোককে জেতানোর জন্য অধীর চৌধুরীকে হারিয়েছিলাম। আমি অনুতপ্ত"।
না। এখানেই শেষ নয়। জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীরের দাবি, "চব্বিশে যা হয়েছে তা হয়েছে, উনত্রিশের লোকসভায় ইউসুফকে গো-হারান হারাবো"।
মেরুকরণের রাজনীতি
চব্বিশের লোকসভায় নিজের পরাজয়ের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধীর চৌধুরী বলেন, "আমাকে হারানোর জন্য রামনবমীতে হুমায়ুনকে দিয়ে দাঙ্গা বাধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর হুমায়ুনকে বলতে শোনা যায়, জেলায় তিরিশ শতাংশ হিন্দু, সত্তর শতাংশ মুসলিম। তাই, মুসলিমরা চাইলে হিন্দুদের কেটে ফেলে ভাগীরথীর জলে ভাসিয়ে দিতে পারে। এরপর, ওই হুমকির ভিডিয়ো হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় ছড়িয়ে দেয় আইপ্যাক। যাতে করে, হিন্দু ভোট পুরো বিজেপি-র দিকে যায়। অন্যদিকে, ইউসুফ পাঠানকে প্রার্থী করে মুসলিম ভোট পেতে মেরুকরণের রাজনীতি করে তৃণমূল "।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এখানেই শেষ নয়। বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে প্রার্থীর ধর্মীয় পরিচয় দেখে ভোট দেওয়ার রেওয়াজ ছিল না। একদা আরএসপি-র ত্রিদিব চৌধুরী ও পরবর্তীকালে কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী বহরমপুর থেকে সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। গত চার-পাঁচ দশকজুড়ে এই দুজনই ছিলেন লোকসভায় বহরমপুরের জন প্রতিনিধি। চব্বিশের লোকসভায় তৃণমূল ইউসুফ পাঠানকে গুজরাত থেকে 'আমদানি' করে জনসভায় বলতে থাকে:এতদিন আপনারা অমুসলিম প্রার্থীদের জিতিয়েছেন, এবার অন্তত মুসলিম প্রার্থীকে জেতান।
মেরুকরণের রাজনীতিতে অধীর চৌধুরী তখন পরাজিত হলেও, নৈতিকভাবে তিনিই জয়ী, মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। ওয়াকফ-বিরোধী আন্দোলনে মুর্শিদাবাদ যখন জ্বলছে, তখন কফিমাগে চুমুক দিয়ে সমাজমাধ্যমে নিজের ছবি পোস্ট করেছিলেন ইউসুফ পাঠান। এমনকি, অতি সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডে জেলার পরিযায়ী-শ্রমিকের মৃত্যুতে যখন বেলডাঙা-সহ জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখনও সবার আগে অধীর চৌধুরীই শোকার্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ঝাড়খণ্ড পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আজ, এতদিন পর, হুমায়ুন কবীরও তাই 'অনুতপ্ত'। 'অনুতপ্ত' বহরমপুরের মানুষও। এবং এখানেই 'পরাজিত' অধীর চৌধুরীর 'নৈতিক জয়'।