এক অভাবনীয় ধর্মীয় মেরুকরণের আবহে বাংলার বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে এবার। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, হিন্দু-মুসলমান রাজনীতি যে আগে ছিল না তা নয়, কিন্তু শাসক ও বিরোধী দু-পক্ষই যেভাবে 'ধর্মে'র উপর সব কিছু...
এক অভাবনীয় ধর্মীয় মেরুকরণের আবহে বাংলার বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে এবার। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, হিন্দু-মুসলমান রাজনীতি যে আগে ছিল না তা নয়, কিন্তু শাসক ও বিরোধী দু-পক্ষই যেভাবে 'ধর্মে'র উপর সব কিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে ভোটের ময়দানে নামছে, বাংলায় এ দৃশ্য বিরল বললেও কম বলা হয়। বিরোধী দল বিজেপির কড়াপাকের হিন্দুত্বের মোকাবিলায় শাসক তৃণমূলও নরমপাকের হিন্দুত্বকে শো-কেসে সাজাচ্ছে। তাই, একদিকে যখন বাংলার প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে রথযাত্রা শুরু করতে চলেছে গেরুয়া শিবির, অন্যদিকে তখন জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু করে মহাকাল মন্দিরের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে ঘাসফুল শিবিরকে, 'উন্নয়নের পাঁচালি' সত্ত্বেও।
পরিবর্তন রথযাত্রা
দোলযাত্রার পর থেকেই জনসংযোগের মাধ্যম হিসেবে বিধানসভা ধরে-ধরে রথযাত্রা শুরু করছে বিজেপি। এই রথযাত্রাকে কীভাবে লোকারণ্য করে তোলা যায়, তার কলা কৌশল ঠিক করতে এদিন সল্টলেকের একটি হোটেলে বিজেপির হাইপ্রোফাইল বৈঠক শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধার দিক কীভাবে দেড়-দুমাসের অল্প সময়ের মধ্যে রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভার ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিয়েও শলা পরামর্শ চলছে এদিন। এবং, গেরুয়া ধ্বজায় হিন্দুত্বের হাওয়া তোলার রণকৌশলও ঠিক করা হচ্ছে।
এহেন হাইপ্রোফাইল বৈঠকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে ভূপেন্দ্র যাদবের মতো কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত রয়েছেন। এখনও পর্যন্ত যা খবর, গোটা রাজ্যকে বেশ কয়েকটি অঞ্চল বা জোনে ভাগ করে ১০ টি রথযাত্রা বেরোবে।
হিন্দুত্বের রথ
১৯৯০ সালে বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানীর রথযাত্রা এ-দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে হিন্দুত্বের যে-ভিত গড়েছিল, তারই সৌজন্যে আজ আর্যাবর্তে বিজেপির এই রমরমা। কেন্দ্রে তখন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সরকার। সঙ্গে দুই জোট, বাম ও বিজেপি। যদিও, বিজেপি মন্ত্রিসভায় অংশ নিলেও বামেরা তা নেয়নি। এমতাবস্থায়, ঠান্ডা ঘরে পড়ে থাকা মণ্ডল কমিশনের রিপোর্টকে ধুলো ঝেড়ে বার করে আনলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ। সংরক্ষণ নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হল আন্দোলন। প্রশ্ন উঠল, সংরক্ষিত পদ যদি আরও বাড়ে, তাহলে যাঁরা সংরক্ষণের আওতার বাইরে রয়েছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে। এমতাবস্থায়, কমণ্ডল নিয়ে রথযাত্রায় বেরোলেন অধুনা বিজেপির কোণঠাসা মার্গ দর্শক ও একদা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পথ প্রদর্শক লালকৃষ্ণ আদবানী। শুরু হল 'মণ্ডল' বনাম 'কমণ্ডলে'র লড়াই। যার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি মোটেও। 'মণ্ডল' = নিম্নবর্ণের হিন্দু, 'কমণ্ডল' = উচ্চবর্ণের হিন্দু। ১৯৯০-এর ২৫ সেপ্টেম্বর সোমনাথ থেকে তাঁর রথযাত্রা শুরু করেন তৎকালীন বিজেপি সভাপতি লালকৃষ্ণ আদবানী। দশ হাজার কিলোমিটারব্যাপী এই রথযাত্রা শেষ হওয়ার কথা ছিল অযোধ্যায়, রামমন্দিরের দাবিকে চ্যাম্পিয়ন করতে। এমতাবস্থায়, রথযাত্রার পথে-পথে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। গুজরাত, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ হয়ে বিহারে এসে পথরুদ্ধ হয় আদবানীর রথ। সেখানে তখন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। হিন্দুরথের পথ আটকে দিয়ে আদবানীকে গ্রেফতার করে লালুপ্রসাদের সরকার।
বাংলায় গেরুয়া-রথ
পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, উনিশের লোকসভা নির্বাচন থেকেই বাংলায় ভোটের আগে রথযাত্রার সংস্কৃতি শুরু করে বিজেপি। যদিও প্রশাসন তার অনুমতি পাওয়া যায় না। আইন-আদালত করে শেষে নমো-নমো করে রথযাত্রা সারতে হয় বঙ্গবিজেপিকে। কিন্তু, এবারের পরিস্থিতি এক নয়। বাংলায় মেরুকরণের রাজনীতি এখন নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে বিজেপির হিন্দুত্ব, অন্যদিকে হুমায়ুন কবীরের বাবরি মসজিদ এবং তার মাঝে দুর্গাঙ্গন-মহাকাল মন্দির। শুধু তা-ই নয়। বাংলার সাধারণ নির্বাচনে এর আগেও আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল মিম অংশ নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু এবার তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেশি। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মালদহে প্রবল হাওয়ায় মিম-এর পতাকা উড়ছে। হুমায়ুনের জনতা উন্নয়ন পার্টি, আইএসএফ আর মিম-এর মধ্যে জোট-জল্পনা চলছে। এবং, একদিকে বিজেপির যখন বলছে, 'হিন্দু খতরেমে হ্যায়', অন্যদিকে তখন মুর্শিদাবাদ-মালদহে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে ধস নামছে।
সাড়ে তিনদশক আগে বিহারে আদাবানীর রথ রুখে দিয়েছিলেন লালুপ্রসাদ যাদব। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলায় বিজেপির লোকারণ্য রথযাত্রার পথ কি সুগম হবে? নাকি, লালু প্রসাদের পথে হেঁটেই বিজেপির যাত্রা-ভঙ্গ করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?